বিশ্বব্যাপী শিক্ষার পেশাজীবী সংগঠনের (এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল) ভবিষ্যৎ বাণীতে পাওয়া যায় যে বিশ্ব শিক্ষক দিবস একদিন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভের পাশাপাশি বিশ্বের সব দেশে একযোগে উদ্‌যাপিত হবে। তাদের মতে, শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্নটি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৬৬ সালে আইএলও ও ইউনেসকোর মধ্যে যে স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, প্রতিটি দেশ তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়। ১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে প্যারিসে এক আন্তসরকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে আইএলও ও ইউনেসকো শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদাবিষয়ক একটি যৌথ সুপারিশমালা প্রণয়ন করে, যা শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানজনক অবস্থানে নেওয়াসহ তাদের মৌলিক ও অব্যাহত প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা বিধানের প্রক্রিয়া, পেশাগত স্বাধীনতা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন, দায়িত্ব ও অধিকার, শিক্ষাসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, দেনদরবারের কৌশল–সংক্রান্ত দক্ষতা, কার্যকর শিক্ষাদান ও শিক্ষণের পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মাইলফলক হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে। মূলত ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর ইউনেসকোর ২৬তম অধিবেশনে সংস্থার তৎকালীন মহাপরিচালক ফ্রেডারিক এম মেয়র এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালের অনুরোধে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদ্‌যাপিত হয়। সেখানে সবাই ঐকমত্য প্রকাশ করেন যে বর্তমান বিশ্বে শিক্ষকেরা একটি বহুসাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে মেধা ও শ্রম দিয়ে চলেছেন। এ জন্য তাঁদের সেই অবদানের বিষয়টি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অন্যান্য পেশাজীবী যেন সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, তার ওপর গুরুত্বারোপের জন্য ইউনেসকো ও এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল দিনটি উদ্‌যাপনের উদ্যোগ নেয়। প্রতিবছর শিক্ষা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের অবদান তুলে ধরার জন্য এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল একটি জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযানও চালিয়ে থাকে।

২০২৬ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াই: পেশা রক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনে ৬০ বছর’। এ জন্য প্রতিপাদ্যটি একদিকে যেমন বিগত ৬০ বছরের অর্জনকে স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যদিকে বর্তমান বৈশ্বিক শিক্ষা সংকট মোকাবিলায় শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর জোরালো আহ্বান জানায়। এই প্রতিপাদ্যকে প্রধান তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করা যায়:

১. পেশা রক্ষা: বিশ্বজুড়ে মানসম্মত শিক্ষকের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ মিলিয়ন অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন। প্রতিপাদ্যটিতে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয়, নিরাপদ ও টেকসই পেশা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাবিদ হিসেবে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে স্বাধীনভাবে শেখানোর অধিকার ও নীতি-নির্ধারণে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং বৈষম্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক চাপ থেকে মুক্ত নিরাপদ কর্মক্ষেত্র গড়ে তোলা।

২. মর্যাদা বৃদ্ধি: সমাজে শিক্ষকদের অবস্থান, সম্মান এবং তাঁদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত প্রদানের সুযোগ এবং তাঁদের দক্ষতা মূল্যায়নের পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্মানজনক বেতন স্কেল, কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিক মানসম্মত প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন জরুরি।

৩. ভবিষ্যৎ গঠন: শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি শিক্ষক। সুতরাং দক্ষ শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা অসম্ভব। শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নেতৃত্বে উন্নীত করার মাধ্যমে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর ঘটে। জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে শিক্ষকই প্রধান ভূমিকা রাখতে পারেন।

বিশ্বব্যাপী বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যে সংকট বিদ্যমান, সেই পটভূমিতে প্রতিপাদ্যটি যুক্তিসংগত; বিশেষত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি জাতির মেধা, মনন ও ভবিষ্যৎ গঠনের মৌলিক ভিত্তিও বটে। যেকোনো সমাজের টেকসই উন্নয়ন, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের পেছনে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। বহু দশক ধরে শিক্ষকদের পেশাগত সংগ্রাম, মর্যাদা রক্ষা এবং মেধার স্বীকৃতি আদায়ে যে নিরন্তর পথচলা অব্যাহত রয়েছে, তা রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আবশ্যক।