শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬Loginবন্ধুদের লেখাকার্যক্রমফিচারখেলাক্যারিয়ারমনোবন্ধুফটো ফিচারবন্ধুসভা সম্পর্কে ফিচারভ্রমণ শহরবন্দী মেঘমালা জপে, মোদের তৃষিত চোখলেখা: জিহাদ আল মেহেদী ও ইভান ইকরামপ্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭: ৫০ ২০২২ সালের মাঝামাঝি কোনো এক বৃষ্টির মৌসুম। ১৫-১৬ জন তরুণ-তরুণীকে নিয়ে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে ভিড়ল এক নৌকা। তখনো বিকেল মিলিয়ে গোধূলি আসেনি; বর্ষার মৌসুমে ফুলে-ফেঁপে ওঠা হাওরে শেষ বিকেলের আলো যেন ছড়িয়ে দিয়েছে নিযুত স্বর্ণরেণু। কিছুক্ষণ আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, বাতাসে এখন তারই জলজ গন্ধ। আর যে পেঁজা একটুকরো মেঘ ওই বৃষ্টি নামিয়েছিল, সে তার শেষটুকু নিয়ে ভেসে যাচ্ছে দূর পাহাড়ের সানুদেশে। ভেজা মেঘ ভেসে যাওয়ার অলৌকিক ওই দৃশ্য আনমনা হয়ে দেখছেন দুই তরুণ। নৌকার ছাদে আর গলুইয়ে বসে তাঁরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন কাঁটাতারের ওপারে; পাহাড়ের পানে। টাঙ্গুয়ার জলরাশির সৌন্দর্য ছাপিয়ে তাঁদের দুজনের মনেই বাসা বেঁধেছে প্রশ্ন—ওই মেঘের জন্ম কোথায়? কী আছে পাহাড়ের ওপাশে?
সন্ধ্যা নামার পর একে একে জ্বলে উঠল সীমান্তের আলো, দেখে মনে হলো দেয়ালের শরীরে শত ছেঁড়া রং। নৌকার ছাদে শুয়ে অনন্ত নক্ষত্রবীথি গুনতে গুনতে সে আলো এসে লাগল তরুণদ্বয়ের, মানে আমাদের চোখে। দিনের বেলায় যা ছিল শুধু দূরের দৃশ্য, রাতের আলোয় তা যেন হয়ে উঠল অতি নিকটবর্তী। ওপারে আভাস পাওয়া গেল মানুষ চলাচলেরও। কেউ হয়তো ঘরে ফিরছে, কারও রাত শুরু হয়েছে। আমাদের দিক থেকে দেখলে শুধু কয়েকটি আলো। আবারও মনে হলো, ওপারের আলো ছাপিয়ে কখনো কি যেতে পারব দূর পাহাড়ের গায়ে?
অবশেষে সুযোগ পাওয়া গেল ২০২৩ সালে। সেবারই প্রথম মেঘালয়ে আসা। তারপর আবার। এবারও। তবে এ আলাপ আমাদের প্রথম বা দ্বিতীয়বারের মেঘালয় ভ্রমণ নিয়ে নয়। এ আলাপ আমাদের এবারের মেঘালয়কে চেনা নিয়ে, নিজেদের খোঁজার এক অন্তহীন যাত্রাকে নিয়ে।
ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের বেড়াজাল ডিঙিয়ে আমরা এবার যখন ডাউকিতে পা রাখলাম, ছোটখাটো আর হাসিখুশি চেহারার নেপালি যুবক সানি গুরুংকে দেখতে পেলাম। ইমিগ্রেশন থেকে বেরিয়ে তাকে হাসতে দেখলাম, মনে হলো এবারও আগেরবারের সেই যাত্রাটাই শুরু হতে যাচ্ছে। শুধু আমরাই মাঝখানে কিছুদিনের জন্য হয়তো অন্য কোথাও ছিলাম। অন্য কোথাও বলতে তো সেই ঢাকা। অফিস, রাস্তা, মাসের বাজার, ভাড়া বাসা; যে জীবনে ফিরে গিয়ে ভ্রমণের ছবিগুলো একসময় ফোনের অনেক নিচে নেমে যায়। পরের সফরের আগে সেগুলো আবার খুঁজে বের করতে হয়।
সানির ছবি খুঁজতে হয় না, ও থাকে আমাদের হৃদয়ে। সানি আমাদের বহু বছরের পুরোনো শোফার কাম গাইড। মেঘালয়ে এসে তাকে দেখার মধ্যে বাড়তি একধরনের স্বস্তি আছে। কোথায় যেতে হবে, কোন পথ ভালো, কতক্ষণ লাগবে—কিছু সময়ের জন্য এসব চিন্তা অন্য একজনের ওপরে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেওয়া যায়। ডাউকি বাজারে ব্রেকফাস্ট আর টাকা ভাঙানোর পর শুরু হলো আমাদের শিলং অভিমুখে যাত্রা। এবার দেখার তালিকা ছোট। মাউলিনং, রিওয়াই লিভিং রুট ব্রিজ, স্নোংপেডেং, এলিফ্যান্টস ফলস আগেই দেখা হয়েছে। সেসব বাদ দিতে গিয়ে মনে হলো, একটি জায়গায় ফিরে আসার এটিও সুবিধা—সবকিছু দেখার দায় আর থাকে না। এবড়োখেবড়ো রাস্তা পেরিয়ে সেই সেতুর ওপরে পৌঁছালাম, যাকে ওপারের বাংলাদেশ থেকে দেখে এত দিন শুধু হা-হুতাশই করেছি। উমগটের সাসপেনশন ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে বিষাদ আর ভালো লাগার এক মিশ্র অনুভূতিতে মন ভরে গেল। এতটুকুই তো দূরত্ব! অথচ কী বিশাল বৈপরীত্য আমাদের মধ্যে।
ওখানে বুকভরে নিশ্বাস নেওয়ার পর আবারও চলতে শুরু করল আমাদের গাড়ি। সানি গুরুং গাড়ি তুলছে পাহাড়ের দিকে। নিচের বাজার, মানুষের চলাচল, সীমান্ত পার হওয়ার এতক্ষণের ব্যস্ততা রয়ে গেল পেছনে। রাস্তা বাঁক নিচ্ছে। মাঝেমধ্যে দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে, তারপর কাছের গাছপালা এসে ঢেকে দিচ্ছে। আমরা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি। এখনই কোথাও নামতে হবে না। ঢাকায় গাড়ির জানালা দিয়ে তাকানোরও একটা উদ্দেশ্য থাকে। সামনে জট কতখানি, পাশের লেন এগোচ্ছে কি না, পরিচিত মোড়টি আর কত দূর। সেই অভ্যস্ততায় এখানেও বাইরে দেখতে দেখতে কয়েকবার মনে হলো, আমাদের কিছু একটা হিসাব করার কথা ছিল। কী হিসাব করার কথা ছিল, কিছুক্ষণ পরে তা আর মনে পড়ল না।