বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি আয়োজনলাল ঘোড়া আর কচুপাতার দিনগুলোলেখা: খ. ম. রেজাউল করিমপ্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ২০ অলংকরণ: মাসুক হেলালগ্রাফিকস: প্রথম আলোস্মৃতি মানুষের জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। বিশেষ করে শৈশবের সেই ধুলোমাখা দিনগুলো যখন ফিরে দেখি, তখন মনে হয় জীবনটা কতই না সহজ-সরল, আনন্দময় ও প্রকৃতিনির্ভর ছিল। আজকের যান্ত্রিক নাগরিক জীবনের কোলাহলে সেই দিনগুলো যেন এক একটি স্নিগ্ধ সজীবতার আখ্যান।

আমার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল আমাদের এলাকার আলোকবর্তিকা রূপাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রূপাখাড়া গ্রামে ১৮৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এ অঞ্চলের দেড় শ বছরের বেশি সময়ের জ্ঞানালোকের উৎস।

সময়টি ছিল ১৯৭৮ সালের এক গ্রীষ্মের সকাল। আজ স্মৃতির ডায়েরির পাতা উল্টে মনে পড়ছে আমার স্কুল জীবনের সেই প্রথম দিনটির কথা। বয়সে ছোট থাকলেও সেই দিনের অনুভূতির তীব্রতা ছিল প্রখর। সকালে কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে পান্তাভাত খেয়ে মেজ মামার হাত ধরে আমি প্রথম স্কুলের আঙিনায় পা রাখি। বড়দের হাত ধরে অজানার পথে পা বাড়ানোর সেই মিশ্র অনুভূতিÑভয় আর উত্তেজনা আজও আমাকে শিহরিত করে। মামার সেই ভরসার হাতটিই আমাকে চিনিয়েছিল এক নতুন ও অচেনা জগৎকে।

স্কুলের আঙিনায় পা দিয়েই সেদিন আমি অবাক হয়েছিলাম। প্রথম দিনেই কোনো বই-খাতার নীরস চাপ নয়, বরং আমি সাক্ষী হলাম এক জাঁকজমকপূর্ণ ‘বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানের। বড় ভাই-বোনদের কেউ গান গাইছে, কেউ আবৃত্তি করছে, আবার কেউবা মগ্ন হয়ে অভিনয় করছে। সেই শৈশবে প্রথম দিনেই বুঝে গিয়েছিলাম, স্কুল মানে শুধু পাঠ্যবইয়ের চারদেয়াল নয়; স্কুল মানে শিল্প, সংস্কৃতি আর নিজেকে আত্মপ্রকাশের এক বিশাল আকাশ।

আমাদের সময় স্কুল ছিল সত্যিকারের এক উৎসবের নাম। স্কুলঘরটি ছিল মাটির তৈরি, ওপরে টিন। জানালা-দরজার কপাটগুলো ছিল অবারিত। আমরা অনেক সময় দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে জানালা দিয়েই লাফিয়ে ক্লাসে ঢুকতাম। দ্রুত বইপত্র বেঞ্চে রেখে বিশাল মাঠে দৌড়ে গিয়ে শুরু করতাম খেলাধুলা। ঘণ্টা পড়ার আগ পর্যন্ত চলত এই অদম্য দস্যিপনা। তখন আশপাশে কোনো দোকানপাট ছিল না, এমনকি ‘টিফিন’ মানে যে সুস্বাদু জলখাবার, তা–ও আমাদের জানা ছিল না। আমাদের কাছে টিফিনের বিরতি মানেই ছিল প্রখর রোদের মধ্যে প্রাণভরে ধুলোমাখা খেলা। আর বর্ষায় যখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামত, তখন মা–বাবার শাসন অমান্য করে মাথায় কচুপাতার প্রাকৃতিক ছাতা দিয়ে, শার্ট খুলে বইয়ের চারপাশ দিয়ে বেঁধে আমরা ভিজতে ভিজতে স্কুলে যেতাম।

আমাদের স্কুলের শিক্ষকেরা ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক, তবে শাসনে ছিলেন কড়া। তাঁরা প্রায় সবাই আশপাশের গ্রাম থেকে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে স্কুলে আসতেন। রূপাখাড়া গ্রামটি আগে থেকেই এ অঞ্চলের মধ্যে আলোকিত গ্রাম ছিল এবং এই গ্রামেরই আমাদের চারজন শিক্ষক ছিলেন। প্রধান শিক্ষক সুদর্শন সাত্তার স্যার ছিলেন অত্যন্ত রাগী মানুষ; অনিয়ম তিনি বিন্দুমাত্র বরদাশত করতেন না। আমরা তাঁকে রীতিমতো বাঘের মতো ভয় পেতাম। ঠিকমতো পড়া না পারলে জুটত জোড়া বেতের পিটুনি।