বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি পাঠকরবীন্দ্রনাথ-নজরুল সম্পর্ক: প্রভাব ও প্রণতিলেখা: হাফিজ রহমান, কবি ও নজরুল গবেষকপ্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০: ০৩ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামবাংলা সাহিত্যের প্রধান দুই কবিকে নিয়ে বাঙালি জাতি বিভক্ত হলেও তাঁদের দুজনের মধ্যে ছিল পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। ভালোবাসা, স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন নজরুলকে সন্তানের মতো স্নেহ করতেন, তেমনি কাজী নজরুলও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তথাপি আমাদের সমাজে দারুণভাবে বয়ান তৈরি করা হয় যে কাজী নজরুলকে পাগল বানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ; তা না হলে কাজী নজরুল ইসলামই নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতেন। কী ভয়ানক মন্তব্য! অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে যখন ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নোবেল পুরস্কার পান, তখন কাজী নজরুলের বয়স মাত্র ১৪ বছর। বলতে গেলে উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো পরিচিতি নজরুলের ছিল না। ছিল না উল্লেখ করার মতো কোনো প্রকাশিত লেখাও। বস্তুত কাজী নজরুলও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত, উপকৃত ও স্নেহসিক্ত। রবীন্দ্রনাথের প্রায় অধিকাংশ লেখাই কবি নজরুল পড়ে শেষ করেন। নজরুল অন্যান্য গান দু-একটি গাইলেও মূলত রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন।
‘... সে মূলত গাইত রবীন্দ্রনাথের গান। এত বেশি রবীন্দ্র–সঙ্গীত সে কি করে মুখস্ত করেছিল তা ভেবে আমরা আশ্চর্য হয়ে যেতাম। সমস্ত কুরআন যারা মুখস্ত করেন তাঁদের হাফিজ বলা হয়। আমরা বলতাম নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র–সঙ্গীতের হাফিজ।’ [মুজফ্ফর আহ্মদ, কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, পৃ. ৫৮-৫৯]
নজরুল কবিতায় অসির ঝনঝনা স্বতঃসিদ্ধ। পক্ষান্তরে প্রীতিগীতিতে কল্পনাতীত কোমল। গীতস্পন্দিত হৃদয়িক পরশ শ্রোতাকে সমান্তরালে আকর্ষণ করে। এর অন্যতম কারণ, রাবীন্দ্রিক চেতনার সাগরে নজরুলের সুনিবিড় অবগাহন। ১৯১৭ সালে করাচির সেনানিবাসে রচিত ‘ব্যথার দান’ গল্পে তিনি রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু গান ব্যবহার করেন। এ প্রসঙ্গে ‘নজরুল জীবনী’ গ্রন্থে নজরুল–গবেষক রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, ‘নজরুলের বয়স তখন ১৮ থেকে ২০। ঐ বয়সের একটি গ্রামীণ বাঙালি মুসলমান ছেলে করাচি সেনানিবাসে রচিত গল্পে যেসব রবীন্দ্র সঙ্গীতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা থেকে এক পরিমার্জিত, পরিশীলিত রুচির শিল্পীমানসের সন্ধান পাওয়া যায়।’
জীবদ্দশায় নজরুলের সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। ৩৮ বছরের ব্যবধান দুইজনের মাঝে। তথাপি নজরুলের কবিতা রবীন্দ্রনাথ পাঠ করতেন। তিনি নজরুল-কবিতার বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন। ১৯২০ সালে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নজরুলের তিনটি কবিতা: ‘শাত-ইল আরব’, ‘বোধন’ ও ‘খেয়া পারের তরণী’। নজরুলের কবিতাগুলোর বলিষ্ঠতা ও স্বাতন্ত্র্য রবীন্দ্রনাথেরও নজর এড়ায়নি। কবি তাঁর একান্ত সচিব সুধাকান্ত রায় চৌধুরীর মারফত নজরুলের কবিতার তখন নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। ‘নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই সাহিত্যিক আগ্রহের কথা বন্ধু মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কাছ থেকে জেনে আরও উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। কবিকে দেখা ও তাঁর সংগে পরিচিত হবার জন্যে নজরুল তখন ব্যাকুল।’ [ড. বাঁধন সেনগুপ্ত, কবি নজরুল ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, (কোলকাতা: পুনশ্চ প্রকাশনী, ২০১০), পৃ. ১৪-১৫].
উগ্রহিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় কর্তৃক নজরুল যখন নির্দয়ভাবে আক্রান্ত, তখন রবীন্দ্রনাথের স্নেহছায়া তাকে আচ্ছাদিত করে রাখে। কবিগুরুর ভয় ছিল, আবেগপ্রবণ নজরুল সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে কাব্যচর্চা বন্ধ করে না দেয়! তা ছাড়া ব্রিটিশ শাসকদের প্রতিশোধের কবলে পড়ে নিরাপরাধ দেশপ্রেমিক কবি অকালেই নিঃশেষ না হয়; সে কারণে তিনি নজরুলকে অভয় দান ও তার সাহিত্যচর্চাকে বেগবান রাখতে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উপহার দেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সের নবীন কবি, কাজী নজরুল ইসলাম আলীপুর জেলে কারারুদ্ধ। তাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেন। ১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে উৎসর্গিত তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটির দুটি কপি পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মারফত আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে নজরুলকে পাঠান। বাংলা সাহিত্যে নবাগত চব্বিশ বছরের নবীন কবি নজরুলকে সেদিন রবীন্দ্রনাথ তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি উপহার নয়, উৎসর্গিত গ্রন্থ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। এমন উদাহরণ রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তাঁর আগে বা পরে আর নেই। বিচারাধীন নবীন কবি নজরুল তা পেয়ে বিস্মিত, আনন্দিত ও গর্বিত। তাঁর কাছে ব্যাপারটি ছিল গুরুদেবের আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু রবীন্দ্রপ্রেমীদের অনেকেই তাতে ক্ষুব্ধ হন। তাঁরা কবিগুরুর কাছে এ জন্যে উষ্মা প্রকাশ করাতে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছিলেন, ‘নজরুলকে আমি “বসন্ত” গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাকে “কবি” বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা অনুমোদন করতে পারোনি। আমার বিশ্বাস, তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছে। আর পড়ে থাকলেও রূপ ও রসের সন্ধান করেনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছে মাত্র।’ [ড. বাঁধন সেনগুপ্ত, কবি নজরুল ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, (কোলকাতা: পুনশ্চ প্রকাশনী, ২০১০), পৃ. ১৫-১৬].
এই সময়ে অনেকেই কাজী নজরুলের কাব্যের কাব্যগুণ বিচার ও জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গ তুলে কবিগুরুকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তাই হিন্দুত্ববাদী কবিরা নজরুল সম্পর্কে কবিগুরুর মূল্যায়নকে অতি মূল্যায়ন মনে করে প্রতিবাদ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। তবে তাঁদের কুণ্ঠাবোধহীন মন্তব্য নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রশংসার কণ্ঠ রোধ করতে পারেনি। ‘কথা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সেদিন নজরুলের কাব্য সম্পর্কে আরও বলেছিলেন, জনপ্রিয়তা কাব্য বিচারের স্থায়ী নিরিখ নয়, কিন্তু যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য।’ [ড. বাঁধন সেনগুপ্ত, কবি নজরুল ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, (কোলকাতা: পুনশ্চ প্রকাশনী, ২০১০), পৃ. ১৬].