‘কুঞ্জছায়া গুঞ্জরণের সঙ্গীতে/ওড়না ওড়ায় এ কী নাচের ভঙ্গিতে,/শিউলি-বনের বুক যে ওঠে আন্দোলি।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’ গানের এই চরণে ওড়না কেবল কোনো নারীর পরিধেয় নয়। কবির কল্পনায় শরৎ যেন এক নৃত্যরত নারী। বাতাসে তার ওড়না উড়ছে আর সেই ছন্দে দুলে উঠছে শিউলি-বনের বুক। প্রকৃতি আর নারীর অবয়ব এখানে মিশে গেছে এক অনির্বচনীয় নৃত্যে। ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের ‘পথের বাঁধন’ কবিতাতেও যেন সেই চিত্রেরই আরেক রূপ। কবি লিখেছেন, ‘ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে/দিগঙ্গনার নৃত্য।’ কখনও শরতের হাওয়া, কখনও বর্ষার মেঘ। রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় ওড়না শুধু কাপড় নয়, তার নিজস্ব এক গতি আছে।
ওড়না কেবল বাঙালি নারীর পরিধেয় পোশাকের অন্যতম অংশ নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথাগত পোশাক যেমন সালোয়ার-কামিজ, লেহেঙ্গা, কুর্তির সঙ্গে পরিধেয় অংশ। ওড়নার রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। উর্দু ও হিন্দিতে এর পরিচিত নাম দুপাট্টা, চুন্নি কিংবা অঞ্চলভেদে আরও নানা নামে। ‘দুপাট্টা’ শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত ‘দ্বিপট’ বা ‘দ্বিপট্টি’র সম্পর্কের কথা ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় পাওয়া যায়। অর্থাৎ দুই পাট বা দুই স্তরের কাপড়। বাংলা ‘ওড়না’ শব্দের মধ্যে রয়েছে ওড়া বা আবৃত করার ধারণা। বাঙালি নারীর পোশাকে ওড়নার উপস্থিতিও যেন তেমনই বহুরূপী। কখনও মাথা ছুঁয়ে নেমে আসে কাঁধে, কখনও দুপাশে ছড়িয়ে থাকে, কখনও এক ঝটকায় বদলে দেয় পুরো পোশাকের চেহারা। সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, লেহেঙ্গা কিংবা লং ড্রেস, পোশাক যা-ই হোক, একটি সুন্দর ওড়না তাঁকে দিতে পারে সম্পূর্ণ আলাদা আবহ। প্রাচীন ভারতে নারী ও পুরুষ উভয়েই শরীরের ওপরের অংশে ‘উত্তরীয়’ নামে এক খণ্ড সেলাইহীন কাপড় ব্যবহার করতেন। অজন্তার গুহাচিত্র থেকে বৈদিক সাহিত্যের নানা উল্লেখে সেই উত্তরীয়র উপস্থিতি দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে পোশাকের ধরন বদলেছে, বদলেছে ব্যবহার ও নান্দনিকতা। সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ওড়না আজকের পরিচিত রূপ পেয়েছে।
মোগল আমলে ওড়না সাধারণ পোশাক থেকে রাজকীয় ফ্যাশনের অংশ হয়ে ওঠে। রাজপরিবারের নারীরা মসলিন, রেশম ও জরি দিয়ে তৈরি করা সূক্ষ্ম ওড়না ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে সালোয়ার-কামিজ ও আনারকলি স্যুটের জনপ্রিয়তার সঙ্গে ওড়না হয়ে উঠেছে পোশাকের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শালীনতার ধারণা, আবার সময়ের সঙ্গে সেই গণ্ডি পেরিয়ে ওড়না হয়ে উঠেছে ফ্যাশনের স্বতন্ত্র অনুষঙ্গ।
আজকের সময়ে পোশাকের সঙ্গে ওড়নার মিল থাকতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং অনেক সময় পোশাককে ছাপিয়ে ওড়না হয়ে ওঠে সাজের প্রধান আকর্ষণ। সংগীতশিল্পী মৌমিতা বড়ুয়া ওড়না কেনেন একটু আলাদাভাবে। অন্য অনেকের মতো পোশাক কেনার পর তার সঙ্গে মিলিয়ে ওড়না বেছে নেওয়ার বদলে তিনি প্রায়ই আগে ওড়না কেনেন। তারপর সেটির সঙ্গে মিলিয়ে কামিজের কাপড় বাছেন। এবারও পূজার কেনাকাটা শুরু করেছেন আগেভাগে। পছন্দের সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে মিলিয়ে বেশ কয়েকটি নান্দনিক ওড়না কিনেছেন। মৌমিতার মতে, জামার সঙ্গে মিলিয়ে ওড়না কেনার যেমন চল রয়েছে, তেমনি ওড়নার সঙ্গে মিলিয়ে বা কনট্রাস্ট করে পোশাক বেছে নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। একই সালোয়ার-কামিজ কিংবা কুর্তির সঙ্গে শুধু ওড়না পরিবর্তনে বদলে দেওয়া যায় পুরো সাজের আবহ। পরিচিত পোশাকও পেয়ে যায় নতুন রূপ।
এ বদলে যাওয়ার খেলাটা এখন ওড়নার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। বাজারে তাই ওড়নার বাহারও কম নয়। উজ্জ্বল কনট্রাস্ট, নরম প্যাস্টেল, চোখধাঁধানো প্রিন্ট, দেশীয় নকশা কিংবা সূক্ষ্ম কারুকাজের ওড়না বাজারে বেশি চলছে। রাজধানীর গাউছিয়া ও চাঁদনী চকে নানা ধরনের ওড়নার দেখা মেলে। গাউছিয়ার মূল গলির প্রথম সারির হিজাব কর্নারের ওড়না বিক্রেতা আক্তার হোসেন জানান, সুতি, অরগাঞ্জা, সিল্ক, তসর, কোটা, নেট, মসলিনসহ সব ধরনের ওড়না রয়েছে। একরঙা, প্রিন্ট, চুনরি প্রিন্টের ওড়নার চাহিদা বেশি। এমব্রয়ডারি, সুতার কাজ করা ওড়নাও নিয়মিত বিক্রি করেন তিনি। চাঁদনী চকের আবরণী, রূপালি ওড়না হাউসসহ অন্য দোকানগুলোতেও বর্ণিল ওড়না রয়েছে। বাজার ঘুরে ভারতীয় ওড়নার জোগান ও চাহিদা বেশি দেখা গেছে। গর্জিয়াস ওড়নায় রয়েছে হালকা ও ভারী কাজের লেইস ও ঝালরের ব্যবহার। ফ্যাশনে দেশীয় কাপড়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওড়নাতেও ফিরছে তাঁত, খাদি, বাটিক ও জামদানির নকশা। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোয় সুতি ও হাফসিল্কের ওড়নার উপস্থিতি তাই বেশ লক্ষণীয়। দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড আড়ং, কে ক্র্যাফট, অঞ্জন’স, রঙ বাংলাদেশ, লা রিভসহ বেশ কিছু ব্র্যান্ডে আলাদা ওড়নার কর্নার রয়েছে। কে ক্র্যাফটের স্বত্বাধিকারী খালিদ মাহমুদ খান বলেন, ‘সবসময় সুতি ওড়নার চাহিদা বেশি। আমরা সুতি, হাফসিল্ক ওড়নায় টাইডাই, ব্লক, এমব্রয়ডারি করে থাকি। উৎসবে তো বটেই, বিভিন্ন প্রিন্টের ওড়নাও সারাবছর বেশ চলে।’
কন্ট্রাস্ট ফ্যাশন ডিজাইনারদের মতে, এখন পোশাক আর ওড়নার মধ্যে মিলের পাশাপাশি বৈপরীত্যও হয়ে উঠছে প্রধান আকর্ষণ। প্যাস্টেল রঙের পোশাকের সঙ্গে উজ্জ্বল কমলা, গোলাপি কিংবা নীল ওড়না সাজে এনে দিতে পারে ভিন্নতা। আবার গাঢ় পোশাকের সঙ্গে অফ-হোয়াইট, বেইজ কিংবা নরম প্যাস্টেল ওড়না তৈরি করে পরিশীলিত আবহ। বাহারি প্রিন্ট: সাদামাটা পোশাকে একটু চমক আনতে প্রিন্টেড ওড়নার জুড়ি নেই। ফ্লোরাল, জ্যামিতিক, অ্যাবস্ট্রাক্ট, টাই-ডাই কিংবা ব্লক প্রিন্টের ওড়না জনপ্রিয় হচ্ছে। এক রঙা কুর্তি কিংবা কামিজের সঙ্গে বড় নকশার একটি ওড়না পুরো সাজের চেহারাই বদলে দিতে পারে। আড়ং, কে ক্র্যাফট, রঙ বাংলাদেশসহ দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোর পোশাকে টাই-ডাই, ব্লক প্রিন্ট, বাটিক কিংবা দেশীয় নকশার ওড়নার ব্যবহারও চোখে পড়ে। হাতে আঁকা নকশা, ব্লক প্রিন্ট কিংবা বাটিকের ওড়নায় পোশাকের সঙ্গে যোগ হয় নিজস্বতার ছোঁয়া। একই সঙ্গে সাদামাটা দৈনন্দিন পোশাকও হয়ে ওঠে একটু বেশি উৎসবমুখর। কারুকাজ: ওড়নার সৌন্দর্য শুধু রং কিংবা প্রিন্টে থেমে নেই। সুতি, অরগাঞ্জা, চুনরি কিংবা অন্য কাপড়ের ওপর জরি, সুতার কাজ, চুমকি, পুঁতি ও সিকুইনের কারুকাজও ওড়নাকে করে তুলছে আকর্ষণীয়। কোথাও আবার রয়েছে অ্যাপ্লিকের কাজ। একটি সাধারণ পোশাকের সঙ্গে এমন একটি ওড়না জড়িয়ে নিলে সাজে চলে আসে উৎসবের আমেজ। তবে ভারী কাজের ওড়না বেছে নিলে পোশাকটা রাখা ভালো তুলনামূলক সাদামাটা। আবার পোশাকে যদি থাকে ভারী কারুকাজ, তখন একরঙা কিংবা হালকা কাজের ওড়না রাখে সাজের ভারসাম্য। রঙের বৈচিত্র্য: লাল, হলুদ, কমলা কিংবা টিয়া রঙের মতো উজ্জ্বল রং উৎসবের মৌসুমে বরাবরই নজর কাড়ে। তবে এবার তার পাশাপাশি প্যাস্টেল, অফ-হোয়াইট কিংবা মাটির কাছাকাছি নরম রঙের ওড়নাও সাজে আনতে পারে ভিন্ন আবহ। কখনও ঝলমলে কারুকাজ, কখনও বড় মোটিফ, আবার কখনও একেবারে সাদামাটা একটি ওড়না হয়ে উঠতে পারে পুরো সাজের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।