বরেণ্য কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের কাহিনি অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন কিংবদন্তি পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। চাষী নজরুল আনন্দস্বরূপ। নিপুণ বুদ্ধিদীপ্ত গাঢ় রসের আনন্দ, দেশীয় ঐতিহ্যের মননশীল সাংস্কৃতিক চেতনা ও চিন্তাচর্চার মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করব বলে ওনার চলচ্চিত্র দেখতে বসি।

লেখক ও পরিচালক দুজনই মুক্তিযুদ্ধকে সামনে থেকে দেখেছেন। তাই উপন্যাসের আকারে একটি বৃহত্তর কাহিনি হলেও এবং সেই কাহিনির অনবদ্য চলচ্চিত্রায়ণ হলেও এই চলচ্চিত্রকে মুক্তিযুদ্ধের এবং পরবর্তী স্বাধীন দেশের বাস্তব দলিল হিসেবে বেছে নেওয়া যেতে পারে। চলচ্চিত্রের নাম ‘মেঘের পরে মেঘ’।

কতটা ত্যাগ, যন্ত্রণা, রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তিলে তিলে মরণযন্ত্রণা ভোগ করে ঘাতক পাকিস্তানিদের হাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেই রাক্ষুসে মানুষগুলোকে সঙ্গ দিয়েছে দেশীয় রাজাকার, আল বদর, আল শামসসহ ঘৃণ্য কিছু মানুষ—প্রবীণ পরিচালকের দৃশ্যের পর দৃশ্যের বুননে তা উঠে এসেছে।

এত বড় একটা দেশের এত প্রাণের রক্তক্ষয়ের, উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণার বিনিময়ে দেশের যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, সেই স্বাধীন দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা, পুনরায় রাজাকারদের হাতে নির্মমভাবে অত্যাচারিত হওয়া, ঘাতক রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধা সেজে বসা—এ ধরনের জঘন্য বৈরী ঘটনাও উঠে এসেছে এখানে। যার বাস্তবতা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

লেখক–পরিচালকেরা জীবনজারিত ভেতরের যন্ত্রণার তাড়নায় শুধু ইতিহাসের চাক্ষুস দৃশ্যের নির্মম চিত্র আপন সৃজনশীলতায় তুলে আনেন না, তাঁরা ভবিষ্যৎও দেখতে পান। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত ত্যাগতিতিক্ষার মূল্য কোথায় এসে ঠেকেছে, সেদিনকার ঘাতক দালালরা শুধু বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে না, নিজেরা মুক্তিযোদ্ধা সেজে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পর্যন্ত নানা ফন্দিফিকিরে রাজাকার বানিয়ে তুলছে, সেই অবক্ষয়ের কূট রাজনীতির চিত্র অন্তক্ষরা যন্ত্রণায় এখানে বিস্তৃত হয়েছে।

রাবেয়া খাতুনের বাস্তব কাহিনির চিত্রায়ণের বাস্তব সংলাপ রচনা করেছেন স্বয়ং রাবেয়া খাতুন ও ওয়াকিল আহমেদ। সুন্দর চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন ওয়াকিল আহমেদ ও জ্যোৎস্না কাজী। সহযোগী পরিচালক ছিলেন তারেক শিকদার। সংগীত পরিচালনা করেছেন ইমন সাহা। শুরু থেকেই মন ভালো করে দেওয়া আবহসংগীতের মাধ্যমে আমাদের মন কেমনের জগতে নিয়ে যায়। উত্তম গুহের সুন্দর শিল্পনির্দেশনা একেবারে স্বপ্ন ও বাস্তব দিয়ে আঁকা ছবির মতো চলচ্চিত্রের পরতে পরতে অনুভূত হয়। চাষীর চাঁদের হাটে জ্যোৎস্না এভাবে পরতে পরতে মায়াময় জগৎ তৈরি করে।