মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginপ্রবন্ধসাক্ষাৎকারঅনুবাদবই আলোচনানথিপত্রআর্কাইভ প্রবন্ধমো. মাসুদ আলম মৃত্যু দীর্ঘজীবী হোক: ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সহিংসতার সম্পর্ক আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ২৯ সারকথা
এই প্রবন্ধের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সহিংসতা ও মৃত্যুর গভীর সম্পর্ক। ইতিহাস, দর্শন, মনোবিশ্লেষণ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের আলোকে লেখাটি দেখায়, ফ্যাসিবাদ কেবল ক্ষমতা দখল বা বিরোধীদের দমন করতে সহিংসতার আশ্রয় নেয় না; বরং সহিংসতাকে মহৎ, নৈতিক ও সৃজনশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। একইভাবে, মৃত্যুকেও জাতীয় পুনর্জন্ম, আত্মত্যাগ ও রাজনৈতিক আনুগত্যের চূড়ান্ত নিদর্শনে পরিণত করে। প্রবন্ধটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, ফ্যাসিবাদী সহিংসতার বীজ ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের মধ্যেই নিহিত ছিল। উপনিবেশে গড়ে ওঠা বর্ণভিত্তিক বিভাজন, মানুষকে অমানবিক করে তোলা, সামরিক নিয়ন্ত্রণ, জরুরি আইন ও বিচারবহির্ভূত দমন পরে ইউরোপে ফিরে এসে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোকে শক্তিশালী করে। সোরেল, জেন্টাইলে, রেইক, আরেন্ট, ফুকো, আগামবেন ও এমবেম্বের ভাবনার সূত্র ধরে লেখাটি ব্যাখ্যা করে, কীভাবে ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীকে শত্রু, অমানুষ বা হত্যাযোগ্য জীবনে পরিণত করা হয়। ফ্যাসিবাদ আইন ভেঙেই শুধু কাজ করে না; আইন, আমলাতন্ত্র, প্রযুক্তি, নজরদারি ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনাকেও মৃত্যুর রাজনীতির হাতিয়ার বানায়। জাতীয় বিশুদ্ধতার আকাঙ্ক্ষা, পুনর্জন্মের পৌরাণিক প্রতিশ্রুতি, নেতার প্রতি আবেগময় আনুগত্য এবং সহিংসতার প্রকাশ্য প্রদর্শন মানুষকে এই ধ্বংসাত্মক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে হত্যা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বিষয় না থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব, ঐতিহাসিক প্রয়োজন বা জাতির নিরাপত্তার নামে বৈধতা পায়। প্রবন্ধের শেষ কথা হলো, ফ্যাসিবাদ শুধু বিংশ শতকের ইউরোপে সীমাবদ্ধ কোনো অতীত অধ্যায় নয়; আধুনিক রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদী পুঁজিবাদ, নিরাপত্তা-রাজনীতি ও বৈশ্বিক বৈষম্যের ভেতরেও এর যুক্তি নতুন রূপে টিকে আছে। সামরিকীকৃত পুলিশি ব্যবস্থা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, দখলদারত্ব, শিবির, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, গণনজরদারি ও উদ্বাস্তু ব্যবস্থাপনায় তার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। তাই ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ করতে হলে সহিংসতার মহিমাকীর্তন ও মৃত্যুর স্বাভাবিকীকরণ প্রত্যাখ্যান করে মানবমর্যাদা, নৈতিক বিচার, আইনি জবাবদিহি এবং প্রতিটি জীবনের সমান মূল্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩০ জানুয়ারি ১৯৩৯, ইউরোপীয় ইহুদিদের পরিকল্পিত গণহত্যা ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ার প্রায় দুই বছর আগে, অ্যাডলফ হিটলারের দেওয়া সেই কুখ্যাত দাম্ভিক ও উদ্ধত ভবিষ্যদ্বাণীটির কথা চিন্তা করুন, ‘আজ আমি আবারও ভবিষ্যতের একজন পরিত্রাতা হয়ে উঠব: যদি ইউরোপের ভেতরে ও বাইরের আন্তর্জাতিক ইহুদি অর্থদাতারা জাতিগুলোকে আবারও একটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে সফল হয়, তাহলে তার ফল পৃথিবীকে বলশেভিকীকরণ করা হবে না এবং এর মাধ্যমে ইহুদি জাতির বিজয় হবে না; বরং ইউরোপে ইহুদি জাতির বিনাশ হবে!’ (আরাদ, গুটম্যান ও মার্গালিয়ট, ১৯৯৯: ১৩৪)। হিটলার সমীকরণের শর্তগুলো উল্টে দিয়েছিলেন এবং বিশ্বকে এমন একটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য অন্যদের অভিযুক্ত করেছিলেন, যা তিনি নিজেই শুরু করতে চেয়েছিলেন।
৩ জুলাই ২০২০, মাউন্ট রাশমোরেতে, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (সে সময়ও তিনি প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট ছিলেন) এক নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদের হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, ‘আমাদের স্কুলগুলোতে, আমাদের সংবাদ কেন্দ্রগুলোতে, এমনকি আমাদের করপোরেট সভাকক্ষগুলোতেও এক নতুন উগ্র-বামপন্থী ফ্যাসিবাদ রয়েছে, যা সম্পূর্ণ আনুগত্য দাবি করে। যদি আপনি এর ভাষায় কথা না বলেন, এর আচার-রীতি পালন না করেন, এর মন্ত্র উচ্চারণ না করেন এবং এর আদেশ-নির্দেশ অনুসরণ না করেন, তাহলে আপনাকে সেন্সর করা হবে, নির্বাসিত করা হবে, কালোতালিকাভুক্ত করা হবে, নির্যাতন করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে। এটা আমাদের সঙ্গে ঘটতে দেওয়া হবে না।’
আমরা এক বিভ্রান্তিকর সময়ে বাস করছি, যখন ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চাওয়া ব্যক্তিরা নিজেদেরকে গণতন্ত্রপন্থী হিসেবে চিত্রিত করেন, অথচ মিথ্যাভাবে ফ্যাসিবাদকে বামপন্থী ভাবাদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেন। মাউন্ট রাশমোরে ট্রাম্প তেমনটাই করেছিলেন, ব্রাজিলের উগ্র-ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো বছরের পর বছর ধরে যেমনটা করে আসছেন এবং হিটলার-মুসোলিনিও যেমনটা করেছিলেন। অতীতের ফ্যাসিবাদী নেতাদের মতোই ট্রাম্প অব্যাহত মিথ্যাচার করেছেন এবং অদৃশ্য স্বৈরাচারী শক্তির প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন, যা তাঁর কর্তৃত্ববাদী ও সহিংসতামুখী রাজনৈতিক প্রবণতাকে তুলে ধরে। বস্তুত ট্রাম্প একটি চিরায়ত কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন: ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের পরিচয় অস্বীকার করে এবং তাদের নিজেদের বৈশিষ্ট্য ও স্বৈরাচারী রাজনীতিকে শত্রুদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে প্রথম ও প্রধান হলো সহিংসতার হুমকি। ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের রাজনীতি সামরিক হুমকি, অর্থনৈতিক অবরোধ ও বলপ্রয়োগের নীতিতেও প্রকাশ পায়; ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনেজুয়েলা ও ইরানবিষয়ক নীতিতে এমন প্রবণতা দেখা গেছে।
এই প্রবন্ধের বিশ্লেষণী কাঠামোতে চরম মিথ্যাচার, অপরের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত ভীতির রাজনীতি, একনায়কতন্ত্র ও সহিংসতাকে ফ্যাসিবাদের চারটি প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদ সহিংসতাকে একটি সুন্দর ও নৈতিক শক্তি এবং মহত্ত্ব, পবিত্রতা ও ক্ষমতার উৎস হিসেবে উপস্থাপন করে। রাজনীতির সামরিকীকরণের মাধ্যমে এটি সহিংসতাকে বিস্তৃত করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি যুদ্ধ ও গণহত্যা পর্যন্ত গড়াতে পারে। একটি ভাবাদর্শ, আন্দোলন ও শাসনব্যবস্থা হিসেবে ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক বিকাশে সহিংসতা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ফ্যাসিবাদী প্রচারণা প্রায়ই নিজের সহিংসতাকে কাল্পনিক বা অতিরঞ্জিত হুমকির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা হিসেবে তুলে ধরে। ট্রাম্প, বলসোনারো বা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাষ্য ও নীতির বিশ্লেষণে এই পূর্বপ্রস্তুতিমূলক যুক্তির ব্যবহার শনাক্ত করা যায়। নাৎসি নিপীড়ন ও হলোকাস্টের ক্ষেত্রেও ইহুদি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে নির্মাণ করে সহিংসতা ও গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সমকালীন ইসরায়েলি সহিংসতার পক্ষে উপস্থাপিত কিছু যুক্তিতেও একই ধরনের নিরাপত্তা ও পূর্বপ্রতিরোধের ভাষা দেখা যায়।