শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginবন্ধুদের লেখাকার্যক্রমফিচারখেলাক্যারিয়ারমনোবন্ধুফটো ফিচারবন্ধুসভা সম্পর্কে বন্ধুদের লেখাগল্প মহাকালের পথেলেখা: জাসেদুল ইসলামপ্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ১০ লোনাপানির ধাক্কায় খসে পড়া ব্লক। সেখানে বসে আছ তুমি, নরম পা দুলিয়ে। লালচে সূর্য তলিয়ে যেতে যেতে পানিতে ডুব দিয়েছে নিশ্চুপে। তবু তোমার ভ্রুক্ষেপ নেই কোনো দিকে। জনমানবহীন সমুদ্রসৈকতে তোমাকে কী নামে ডেকে সজাগ করব, ভেবে পেলাম না। অবচেতনে সজাগ করে দিতে চাইলাম। ‘নয়নী’ বলে ডাকলে তুমি খুশি হবে কি না, তা ঠিক জানি না। তোমার শাড়ির আনাড়ি আঁচল হাওয়ায় উড়ছে শিমুল তুলার মতো। চুলগুলোও দুলছে ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।

সমুদ্রের ওপারে আর সীমানা নেই, শুধুই অথই জল। তবু তোমার দৃষ্টি ঠিক সেখানেই। এত তন্ময়তায় তুমি তলিয়ে গেছ যে বাতাসের ঢেউয়ে দুলছে তোমার মন। আর দুলছে আমার হৃদয়। সমুদ্রের সঙ্গে তোমার কোন জন্মান্তরের সখ্য? জানার ইচ্ছা জাগল মনে।গোধূলির আবিরে ধীরপায়ে কাছে ঘেঁষতে চাইলাম তোমার। কোন বিষাদে তুমি বিষাদিতা, তা জানতে চাইলাম একবার। হৃদয়ের তলায় সাহস সঞ্চার করতে পারিনি বলে দূর থেকেই তোমাকে লক্ষ করছি।

ঝটপট অন্ধকার নেমে এসেছে। অন্ধকারের মুখোমুখি হয়ে বসে আছ তুমি। অদূরের ঝাউবন থেকে শোঁ শোঁ বাতাস এসে মন ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। পাখির মতো নীড়ে ফেরার তাড়ায় সমুদ্রতীর থেকে ফিরে যেতে চাইছি। কিন্তু তোমাকে একা ফেলে কীভাবে যাব, বলো? কী নামে ডেকে সজাগ করব তোমায়, তা-ও ভেবে পেলাম না।

সন্ধ্যার অন্ধকারে গাঙচিলের মতো উড়াল দেবে কোন কূলে—সে অপেক্ষায় রইলাম।আচম্বিতে ‘নয়নী’ বলে ডাক দিতেই তুমি ক্লান্ত চোখে তাকালে একবার। মিশমিশে অন্ধকারে তোমার কাজলকালো চোখ মিশে আছে, তবু চোখজোড়া জ্বলছে উজ্জ্বল হয়ে। আর আমি তোমার চোরাবালির মতো দৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে।আবার চোখ তুলে তাকাতেই তুমি ধীরে বললে,— আমাকে ‘নয়নী’ বলে ডাকলে কেন?— তোমার চোখের জন্য।তুমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আঁচলের ভাঁজ থেকে একটি পুরোনো, ভাঁজ করা চিঠি বের করলে আর আঙুল বুলিয়ে বললে,— এই নামে আমাকে শেষবার একজনই ডাকত, জানো? আমার এই চিঠিটা তার লিখা, সে কখনোই জানবে না, আমি আজও তার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।আমি ধীরে বললাম,— সে কোথায়?দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিলে,— এই সমুদ্র তাকে কেড়ে নিয়েছে।

তোমার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, তবু কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল নরম সুরের ঝংকার। একটু থমকে গেলাম। বুকের ভেতর ঢেউ আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।মৃদু হেসে বললাম,— তার জন্যই কি জীবনের সমস্ত সন্ধ্যা অপেক্ষা করবে?তুমি কিছুক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলে। তারপর ধীরে আমার দিকে ফিরে এলে। চোখের কোণে জমে থাকা বিষাদটুকু যেন নরম হয়ে এসেছে।কোনো উত্তর দিলে না আর। শুধু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালে। তারপর নীরবে এসে আমার কনিষ্ঠা ধরে হাঁটতে শুরু করলে।আমাদের আর কোনো কথা হলো না। শুধু পেছনে পড়ে রইল উত্তাল সমুদ্র, নিভে যাওয়া গোধূলি এবং তোমার অপেক্ষার সেই পুরোনো চিঠি।আর আমরা মহাকালের পথে হাঁটতে হাঁটতে মিশে গেলাম মিশমিশে অন্ধকারে।