শিক্ষক শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এই পাঠশালার সীমানায় এই শিশুদের কাছে আমিই রাজা, আমিই প্রজা। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখে, আত্মমর্যাদার পাঠ নেয়। মহারাজ এলে রাজভয়ে বা শিষ্টাচারে যদি আমি তাঁর সামনে মস্তক অবনত করি, তবে আমার আজীবনের দেওয়া পাঠ এক লহমায় অর্থহীন হয়ে যাবে। শিশুরা ভাববে, তাদের যে শিক্ষককে তারা অজেয় ভেবেছিল, তিনিও ক্ষমতার কাছে নতজানু। ওদের মেরুদণ্ড ভাঙার দায় আমি নিতে পারব না।’
কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতায়ও আমরা একই আত্মমর্যাদাবোধের প্রকাশ দেখি। দিল্লির অধিপতি বাদশাহ আলমগীর নিজের সন্তানকে শিক্ষকের চরণে পানি ঢালতে দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এই কারণে যে শাহজাদা কেন নিজ হাতে শিক্ষকের পা ধুয়ে দিল না। শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে শঙ্কিত হলেও শিক্ষক মুহূর্তেই উপলব্ধি করেছিলেন তাঁর নৈতিক অবস্থান পার্থিব রাজদণ্ডের চেয়েও ওপরে। সেদিন শিক্ষক নির্ভীক কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘উচ্চ সে নহে কোনো অংশে তাঁর চেয়ে।’
কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই উপাখ্যানগুলোকে রূপকথার মতো দূরবর্তী মনে হয়। সেই শিক্ষক, সেই শাসক এবং সেই সামাজিক ভিত্তি—তিনটিই আজ রূপান্তরের নামে এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
শৈশবে আমার এক শিক্ষকের মুখে প্রায়ই একটি কথা শোনা যেত—‘শিক্ষক’ মানে হলো, শিখ+হক। শব্দটির অন্তর্নিহিত দাবি হলো শিক্ষার্থীদের ‘হক’ বা সত্য ও ন্যায়ের পথ চেনানো, আর নিজে সেই হক পথে অবিচল থাকা। জীবনের প্রথম আদর্শ বা জীবনের প্রথম ‘নায়ক’ ছিলেন সেই ছেলেবেলার শিক্ষক। তাঁদের জৌলুশ ছিল না, অর্থবিত্তের প্রাচুর্য ছিল না; কিন্তু সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ, কৃষক থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে কথা বলতেন। শিক্ষকতা তখন জীবিকার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল এক আত্মিক ‘ব্রত’। সমাজ গড়ার কারিগরদের জীবনেই একমাত্র অভিপ্রায় যেন ছিল, আধারে আলো ফোটানো।
কালক্রমে সেই ‘ব্রত’ নিছক একটি সাধারণ ‘বৃত্তি’ বা চাকরিতে পর্যবসিত হয়েছে। তার চেয়েও বড় সংকট হলো, বহু ক্ষেত্রে শিক্ষকতা আজ পরিণত হয়েছে ‘শেষ আশ্রয়ে’। অন্যান্য পেশায় সুযোগ না পেয়ে নিরুপায় হয়ে যাঁরা শিক্ষকতায় আসছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই পেশাগত দর্শনের চেয়ে চাকরি টিকিয়ে রাখা বা ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা আদায় করাই মুখ্য হয়ে উঠছে। ফলে যে আত্মনিবেদন ও নৈতিক দায়বদ্ধতা এই পেশার মূল শর্ত ছিল, তা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই নৈতিক ক্ষয়ের পেছনে শুধু ব্যক্তির দায় দেখলে তা হবে একপেশে বিচার। এর পেছনে রয়েছে গভীর কাঠামোগত ও আর্থসামাজিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম নিম্নমানের। একজন শিক্ষক যখন মাস শেষে পরিবারের ন্যূনতম ভরণপোষণ জোগাতে হিমশিম খান, তখন তাঁর পক্ষে সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত আয়ের জন্য প্রাইভেট টিউশনি বা কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ও অর্থনৈতিক অবহেলার সরাসরি ফল। যে রাষ্ট্র শিক্ষককে সম্মানজনক জীবনযাপনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্র শ্রেণিকক্ষে একজন আপসহীন শিক্ষক প্রত্যাশা করার নৈতিক অধিকার কতটা রাখে, সে প্রশ্ন তোলা জরুরি।