শাহজালাল (রহ.) মাজারে চলছে দানের টাকা গণনা। শুক্রবার তোলা সমকাল
সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ৭০০ বছরের প্রথা ভাঙা হয়েছিল আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতার দাবিতে। নির্ধারণ করা হয়েছিল সেখানে থাকা ঐতিহাসিক দানের ডেগে সিলগালা করার। পরে এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা সৃষ্টি হলে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। এমন অবস্থায় এবার আলোচনায় এসেছে মাজারের ব্যয়ের খাত নির্ধারণের ব্যাপারে।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের নেওয়া ডেগ সিলগালার সিদ্ধান্ত পরে প্রত্যাহার করা হলেও মন্ত্রীসহ অনেকের পক্ষ থেকে তাঁর এ উদ্যোগটি প্রশংসিত হয়। তবে মাজার কর্তৃপক্ষ ও ভক্তরা বিষয়টি সহজে মেনে নেননি। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সিলগালা করার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটি এখনও ব্যয়ের নির্দিষ্ট খাত নির্ধারণ করতে পারেনি। ইতোমধ্যে চার দফায় মাজারের দানবাক্স ও ডেগ খোলা হয়েছে। এতে ব্যাংক হিসাবে মোট জমা হয়েছে ২ কোটি ২৯ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪০ টাকা। নগদ টাকার পাশাপাশি সোনা-রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া গেছে। তবে ব্যয়ের খাত স্পষ্ট না হওয়ায় মাজার কর্তৃপক্ষ খরচ কমিয়ে এনেছেন। কর্মচারীদের মূল বেতনের অর্ধেক পরিশোধ করা হলেও মাজার এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী আনসার সদস্যদের জন্য দানের টাকা থেকে প্রায় সাত লাখ টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, নতুন ব্যবস্থাপনা চালুর আগে কর্তৃপক্ষ নিজস্ব আয় থেকে বিভিন্ন ব্যয়ভার বহন করতেন। মাজারে স্থায়ী ১২ জন কর্মচারীর পাশাপাশি প্রায় ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবী ও পাহারাদার রয়েছেন। আগে স্থায়ী কর্মীদের আট থেকে ১০ হাজার এবং অস্থায়ী কর্মীদের দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হতো। পাশাপাশি প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিলসহ আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় হতো। গত ১৮ জুন মাজারের ডেগ ও দানবাক্স সিলগালা করার পর থেকে কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবকদের বেতন-ভাতা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে তাদের প্রাপ্যের মাত্র অর্ধেক পরিশোধ করা হচ্ছে। দানের টাকা কোন খাতে ব্যয় হবে, সেটির অপেক্ষায় রয়েছে মাজার কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতির সুরাহা না হলে তারা উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
মাজারের সরেকওম মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান সমকালকে বলেন, ‘সিলগালা করার এক মাসের মধ্যে ব্যয়ের খাত নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বর্তমানে নিজেদের পক্ষ থেকে এবং দানবাক্সের বাইরে পাওয়া অনুদান দিয়ে আংশিক বেতন পরিশোধ করেছেন। গত মাসে ৪৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসায় বিদ্যুৎ বিভাগের কাছ থেকে সময় নিয়েছেন। তারা চান দানের টাকার সঠিক ব্যয় খাত দ্রুত নির্ধারিত হোক, অন্যথায় বিকল্প ভাবতে হবে।’ মাজার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০০ বছর ধরে বংশপরম্পরায় খাদিম পরিবারগুলো দানের টাকা ভোগ করে আসছে। হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সময়ের শিন্নির বড় তিনটি ডেগ পরবর্তী সময় দানের ডেগ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং দরগাহ এলাকায় বেশ কয়েকটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাকিস্তান আমলে মাজারের জায়গা ওয়াকফর অধীনে চলে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওয়াকফ এস্টেট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে চাইলে আইনি লড়াই শুরু হয় এবং ২০১৪ সালে উচ্চ আদালত মাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষে রায় দেন। এর ফলে ওয়াকফ এস্টেট কেবল বার্ষিক রাজস্ব পাওয়ার অধিকার রাখে, ব্যবস্থাপনার সুযোগ তাদের নেই।
এই দীর্ঘ নিয়ম ভেঙে গত জুন মাসে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম ১৮ জুন তিনটি ডেগ ও পাঁচটি দানবাক্স সিলগালা করে নতুন বাক্স স্থাপন করেন। এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে চার দিনের মাথায় তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে বিদায়ের আগে ২২ জুন তিনি দানবাক্স খুলে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পান এবং নিজের তহবিল থেকে আরও ৫ লাখ টাকা দেন। ওই উদ্যোগ বাস্তবায়নে গত ২৬ জুন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে প্রধান করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। কমিটিতে জেলা প্রশাসককে সদস্য সচিব এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার এবং মাজার ও মসজিদের চারজন সদস্যকে রাখা হয়। এ কমিটির উদ্যোগে পরে আরও তিনবার দানবাক্স খোলা হয়। এর মধ্যে গত ১১ জুলাই ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা, ১৫ আগস্ট ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা এবং সর্বশেষ গত শনিবার ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা জমা হয়। এক মাসের মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থাপনার রূপরেখা প্রণয়নের কথা থাকলেও তিন মাসেও তা চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, সংগৃহীত অর্থ নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদে চলা সম্ভব নয় বলে শিগগির একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হবে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে দানের টাকা থেকে আনসার সদস্যদের বেতন বাবদ প্রায় সাত লাখ টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে।