বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি পাঠকবেপরোয়া কিশোর গ্যাং: লাগাম টানুনলেখা: প্রদীপ্ত মোবারকপ্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৫০ কিশোর গ্যাংপ্রতীকী ছবিএকটি কিশোরের হাতে থাকার কথা বই, খেলার সরঞ্জাম, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়। কিন্তু সেই হাতে যদি ধীরে ধীরে উঠে আসে অপরাধের সংস্কৃতি, তাহলে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার আমাদের সামনে নতুন এক সামাজিক সংকট হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ অপরাধ, আধিপত্য বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহনসহ নানা অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগ উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসছে। কিশোর গ্যাং কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক মূল্যবোধ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে অপরাধের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং–সংস্কৃতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের ছোট ছোট সংঘবদ্ধ দলে যুক্ত হওয়ার ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেও বিভিন্ন সময়ে এমন দলের সদস্যদের আটক করার খবর পাওয়া গেছে। কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রমের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রথমে ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় প্রভাবশালী অপরাধী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় আরও বড় অপরাধে ব্যবহৃত হয়। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক বহন ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক কিশোর বুঝে ওঠার আগেই অপরাধী চক্রের হাতিয়ার হয়ে যায়। তারা হয়তো শুরু করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দল তৈরি বা এলাকায় নিজেদের শক্তি দেখানোর মধ্য দিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই পরিচয় তাদের অপরাধের পথে নিয়ে যেতে পারে।
কিশোরেরা বয়সগতভাবে আবেগপ্রবণ। এই বয়সে স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, বন্ধুদের প্রভাব, দ্রুত পরিচিত হওয়ার চেষ্টা ও পরিবার থেকে পর্যাপ্ত মনোযোগের অভাব অনেক সময় তাদের ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অপরাধী চক্রগুলো এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়। তারা কিশোরদের সামনে সহজ অর্থ, ক্ষমতার অনুভূতি ও সামাজিক পরিচিতির মিথ্যা আকর্ষণ তৈরি করে। একসময় সেই কিশোরেরা নিজেরাই বুঝতে পারে না কখন তারা অপরাধের জালে আটকে গেছে। বিশেষ করে মাদক কারবারে কিশোরদের ব্যবহার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, অপরাধীরা অনেক সময় অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করিয়ে নেয়। এতে শুধু সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, একজন কিশোরের ভবিষ্যৎও ধ্বংস হয়।
দেশে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া সহিংস অপরাধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অপরাধী চক্রের প্রভাব থেকে কিশোরদের দূরে রাখা জরুরি। সাম্প্রতিক কিছু হত্যাকাণ্ড ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনায় অপরাধীদের বয়স, সামাজিক পরিবেশ ও তাদের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তির বয়স কম হলেই তাকে শুধু ‘শিশু’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তার পেছনে থাকা প্রভাব, প্ররোচনা ও সামাজিক কারণগুলোও খুঁজে দেখা প্রয়োজন। কারণ, একটি কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে শুধু একজন অপরাধী তৈরি হয় না; বরং একটি পরিবার, একটি সমাজ ও একটি ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের অনলাইন কনটেন্ট দেখছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। তবে নজরদারি মানে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়; প্রয়োজন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। অনেক কিশোর নিজের সমস্যার কথা পরিবারের সঙ্গে বলতে পারে না। ফলে তারা বাইরের ভুল মানুষের কাছে আশ্রয় খোঁজে। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার আগ্রহ বোঝা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা—এসব ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।
বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেয় না; তারা সামাজিক মূল্যবোধ তৈরির অন্যতম জায়গা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো প্রয়োজন। যে শিক্ষার্থী আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার প্রতি শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি প্রয়োজন সহায়ক ভূমিকা। কারণ, অনেক সময় একটি সঠিক পরামর্শ একটি জীবনকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।