বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন রসালো ট্র্যাজেডি আর ক’টা আছে, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। মাঠের চেয়ে যিনি প্রেস কনফারেন্সের টেবিলে বেশি অনিবার্য, ফুটবল পায়ে মাঠে নামার চেয়ে সংবাদ সম্মলনে মাইক্রোফোনের সামনে যাঁর ঝরঝরে ইংরেজি বেশি সচল—তিনিই কি না বাংলাদেশের অধিনায়ক!
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে আসিয়ান কাপের উদ্বোধনী ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াকে যখন থমাস ডুলি ৯০ মিনিট সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখলেন, আর অধিনায়কের আর্মব্যান্ড সঁপে দিলেন মাঠের ভেতর মিস পাসের মহড়া দেওয়া সোহেল রানার হাতে—তখনই জাকার্তা ছাপিয়ে ঢাকায় এক নির্মম রসিকতা ভেসে বেড়াতে শুরু করেছে। জামাল ভূঁইয়া কি তবে শুধুই ম্যাচ-পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে চটকদার ইংরেজি বুলি আউড়ে মিডিয়ার ক্ষিদে মেটানোর জন্য স্কোয়াডে আছেন? বিশ্ব ফুটবলে বর্তমানে এমন ‘প্রেস কনফারেন্স ক্যাপ্টেন’ আর একটাও আছে কি, যিনি ডাগআউটের অন্ধকারে বন্দি থেকেও দেশের প্রতীক?
৯৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মুকুট মাথায় পরা এই তারকাকে স্রেফ একজন দোভাষী বা ‘লিয়াজোঁ অফিসার’ বানিয়ে রাখার যে দেউলিয়াত্ব ডুলি দেখালেন, তা ফুটবলীয় কৌশলের কোনো সংজ্ঞাতেই পড়ে না। ডুলির এই রহস্যময় দর্শন ফুটবলপ্রেমীদের মনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তা শুধু জামালের অধিনায়কত্বের মহিমাকে নয়, গোটা বাংলাদেশের ফুটবলীয় আত্মসম্মানকেই আজ বড়সড় এক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বছর পয়ত্রিশের এই মিডফিল্ডার নিজেও যে কতটা হতাশ তা তিনি নিজের ভেরিফাইড ফেসবুকের এক পোস্টেই প্রকাশ করেছেন। ‘আজকের ফলাফলে ভীষণ হতাশ। আমাদের এখন আরও ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এখনও ২টা ম্যাচ বাকি আছে। চলো বাংলাদেশ, এগিয়ে যাও।’
জামালের ওপর যে কোচ থমাস ডুলির আস্থা গড়ে উঠেনি তা গেলো জুনে সান ম্যারিনোর বিপক্ষে ম্যাচেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ইউরোপের মাটিতে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে জামাল বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে মোট ৪৫ মিনিট (দ্বিতীয় পুরো হাফ) খেলেছিলেন। শমিত সোমকে উঠিয়ে অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াকে সেদিন মাঠে নামিয়েছিলেন ডুলি। জাতীয় দলে জামালের অনিয়মিত হয়ে পড়ার প্রক্রিয়াটি মূলত ২০২৩ সালের শেষদিক থেকে শুরু। ডেনমার্ক প্রবাসী এই ফুটবলার এখন ছত্রিশ ছুইছুই। হাই-প্রেসিং গেম এবং মাঝমাঠের তীব্র গতির সাথে মানিয়ে নিতে তাঁর কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তাছাড়া হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের মতো ফুটবলাররা দলে আসায় মাঝমাঠে তাঁর জায়গা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে ঘরোয়া ফুটবলে কিন্তু এখনো নিজের জোড়াল উপস্থিতি বজায় রেখেছেন জামাল। ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে গত মৌসুমে তিনি নিয়মিত খেলেছেন এবং প্রায় ১,২৬১ মিনিটের বেশি মাঠে কাটিয়েছেন। লিগের অন্যান্য সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের তুলনায় তিনি ম্যাচ টাইম ভালোই পাচ্ছেন। তারপরেও জামালের চেয়ে মিডফিল্ডে বত্রিশের সোহেল রানার ওপরই বেশি ভরসা রাখছেন কোচ থমাস ডুলি। তা সোহেল যতই ম্যাচে মিস পাস খেলুক না কেন।