মুকিত রহমানী, সিলেট ও জাহাঙ্গীর আলম খায়ের, বিশ্বনাথ
সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলার শেওরা গ্রামে বাড়ি আশিক মিয়ার। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে প্রাইভেটকারে করে সিলেট রওনা হন তিনি। বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর সড়ক ধরে সিলেট যেতে সাধারণত সময় লাগার কথা ৪০-৫০ মিনিট। পথে তীব্র ঝাঁকুনিতে আশিকদের বহনকারী প্রাইভেটকারের বাম্পার খুলে যায়। ঠিকঠাক করে সিলেট পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৮টা বেজে যায় তাদের।
গত মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে এই সড়কের নাচুনি এলাকায় পাওয়া যায় আশিক মিয়াকে। মোটরসাইকেল দিয়ে যাওয়ার পথে সমকালের প্রতিবেদকের কাছে নিজের দুর্ভোগের কথা বর্ণনা করেন তিনি। আশিকসহ স্থানীয় কিছু লোকজনের দেওয়া তথ্যমতে, ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর সড়কটির অর্ধেক অংশই এখন যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী। বিশ্বনাথ অংশের ১৩ কিলোমিটার পার হতেই সময় লেগে যায় ঘণ্টাখানেক। কোথাও উঠে গেছে কার্পেটিং, কোথাও সড়ে গেছে পাথর। এমন জায়গাও দেখা যায়, যেখানে একটানা ৩০-৪০ মিটার পর্যন্ত ভাঙা। সড়ক ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষের ভাষ্য, বৃষ্টি হলে এসব খানাখন্দ ও গর্তে পানি জমে, রোদের দিনে উড়ে ধুলাবালি। এতে নাজেহাল হচ্ছেন তারা।
এদিন দুপুরে এই সড়কের দতা এলাকা দিয়ে খালি সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ফিরছিলেন চালক সুহেল মিয়া। তিনি বিশ্বনাথ নতুন বাজার স্ট্যান্ড থেকে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করেন। তাঁর ভাষ্য, প্রায়ই এই সড়কে অটোরিকশার এক্সেল ভেঙে যায়, কখনও ইঞ্জিনেও কাজ করাতে হয়। একশ টাকার ট্রিপ নিয়ে এদিনই তাঁর চারশ টাকা গচ্চা গেছে। সিলেট থেকে বিশ্বনাথ হয়ে জগন্নাথপুর শহরে যুক্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়কটি দিয়ে দিনে চলাচল করে অন্তত ৮০টি বাস। এ ছাড়া এক হাজার অটোরিকশা ও হাজারখানেক মাইক্রোবাসও যাতায়াত করে। পণ্যবাহী ট্রাকের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি। দুই জেলার কয়েক লাখ বাসিন্দা সড়কটির বিশ্বনাথ অংশের ১৩ কিলোমিটার নিয়ে এক বছর ধরে ভয়াবহ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। মঙ্গলবার দেখা গেছে, বিশ্বনাথ শহর পার হওয়ার পরই ভাঙা শুরু। কালীগঞ্জ বাজার থেকে বাগিচা বাজার পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার অংশে কম হলেও দুই হাজারের বেশি ছোট-বড় গর্ত। দতা এলাকায় একটি জায়গায় ভাঙা অংশ প্রায় ৪০-৫০ মিটার। কোথাও বিটুমিন উঠে গেছে, কোথাও গর্ত হয়ে আছে। সম্প্রতি সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার নির্দেশে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাস্তার কিছু অংশে ইট ফেলে। তবে সরেজমিন এসব ইটের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে কম। পীরের বাজারের আগে কিছু অংশ ভালো থাকলেও পরের অংশে ভাঙা। পূর্ব পীরের বাজারের নাচুনি এলাকায় ইট ও পাথর বের হয়ে আছে।
সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়ন বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর শাখার চেয়ারম্যান এহসানুল হক তৈমুছ জানিয়েছেন, তাদের তিনটি স্ট্যান্ডে ৪৫০টি অটোরিকশা রয়েছে। জগন্নাথপুরের স্ট্যান্ডসহ সড়কে হাজারখানেক অটোরিকশা চলে। কিন্তু বিশ্বনাথ অংশের কারণে নাভিশ্বাস উঠেছে চালক ও যাত্রীদের। রাস্তাটি দ্রুত সংস্কার জরুরি। বাস মালিক সমিতি সিলেট জেলার সদস্য আয়াজ আলী বলেন, প্রতিদিন সিলেট-বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর সড়কে ৮০টি বাস যাতায়াত করে। মাইক্রোবাস চলে হাজারখানেক। সিলেট থেকে জগন্নাথপুরে যেতে ৩০-৪০ মিনিটের পথ এখন দেড় ঘণ্টা লাগে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর সড়কটি ২০২৩ সালে প্রায় সংস্কার করা হয়েছিল। তিন বছরের মধ্যেই সড়কটির অবস্থা বেহাল। সড়কটির জগন্নাথপুর অংশে কাজ দুই মাস আগে শুরু হয়ে সম্প্রতি শেষ হয়েছে। তবে বিশ্বনাথ অংশের দরপত্র আহ্বান করা হবে আগামী নভেম্বরে। ফলে ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। এলজিইডির তথ্যমতে, বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর সড়কের ১৩ কিলোমিটার অংশে আগামী নভেম্বরে দরপত্র আহ্বান হওয়ার কথা রয়েছে। এলজিইডি সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খান বলেন, গ্রামীণ বিভিন্ন সড়কে এবার ইউনিক ব্লকে কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়কের শেষ অংশের কাজ চলছে। আগামীতে কয়েকটি সড়কের দরপত্র হবে। এর মধ্যে বিশ্বনাথ-জগন্নাথপুর সড়কের বিশ্বনাথ অংশও রয়েছে।
ই-মেইল: [email protected], [email protected]