বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬Loginবন্ধুদের লেখাকার্যক্রমফিচারখেলাক্যারিয়ারমনোবন্ধুফটো ফিচারবন্ধুসভা সম্পর্কে বন্ধুদের লেখাগল্প বিলেতফেরত পাত্রলেখা: লুকাইয়া তাজনুরপ্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২: ৩৪ অলংকরণ: মাসুক হেলালপ্রথম দৃশ্য
ঘটক নিত্যানন্দ যেদিন বললেন পাত্র বিলেতফেরত, সেদিনই সন্দেহ হলো; কারণ, ঘটকমশাই আজ পর্যন্ত একটাও সত্যি কথা বলেননি।
গত বছর তিনি দিদির জন্য এক ডাক্তার পাত্র এনেছিলেন। শেষে দেখা গেল সে ডাক্তারখানার কম্পাউন্ডার, আর ডাক্তারি বিদ্যার দৌড় বড়জোর কুইনাইন আর পুরোনো ভাতের তফাত বোঝা পর্যন্ত। তার আগের বছর এনেছিলেন ‘জমিদারের একমাত্র ছেলে’। পরে জানা গেল জমিদার একজনই, কিন্তু ছেলে সাতজন। আর তাঁদের মধ্যে ইনি সপ্তম, যাঁকে বাড়ির কুকুরটাও ঠিকমতো চেনে না।
সালটা ১৯২৪। আমাদের কালীগঞ্জ গাঁয়ে তখন সবে ডাকঘর বসেছে, স্টিমার আসে সপ্তাহে তিন দিন, আর সাহেব বলতে লোকে চেনে শুধু ভাঙা নীলকুঠির গল্প। ঘটকমশাই সপ্তাহখানেক ধরে আমাদের অতিথিশালায় ডেরা বাঁধা, কলকাতার চিঠির অপেক্ষায়। তাঁর একটা নিয়ম আছে—পাত্র পাকা না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের বাড়ির অন্ন মুখে তোলেন না। চা খান, জল খান, কিন্তু ভাত নয়। খিদে পেলে পকেট থেকে মুড়ির ঠোঙা বের করেন। বলেন, ওটা ঘটকদের ব্রত। আমি বলি, ওটা ঘটকদের বাহানা।
সেদিন সকালে সেই ঘটকমশাই যখন অতিথিশালা থেকে ছুটে এসে আমাদের উঠানে হাজির হলেন, বাড়িসুদ্ধ লোকের মুখ এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল যেন ভাদ্র মাসে হঠাৎ পূর্ণিমা উঠেছে।‘কর্তামশাই, এবার আর ফসকাবে না,’ ঘটক হাঁপাতে হাঁপাতে দাওয়ায় বসে পড়লেন। ‘সাত বছর বিলেতে ছিলেন, বুঝলেন? লন্ডন শহরে। ইংরেজি বলেন স্বপ্নেও।’বাবা হাতের হুঁকা নামিয়ে রাখলেন। বাবার মুখে তখন এমন ভাব, যেন কেউ তাঁর হাতে স্বর্গের চাবি তুলে দিয়েছে।‘সাত বছর!’ বাবা গদগদ হয়ে বললেন। ‘বিলেতে এত বছর কী করতেন?’‘পড়াশোনা, কর্তামশাই, পড়াশোনা। রাজা-মহারাজার সঙ্গে ওঠাবসা। শুনেছি টেমস নদীর জলে নাকি রোজ সকালে স্নান করতেন।’
আমি রান্নাঘরের জানালার আড়াল থেকে সবটা শুনছিলাম। টেমস নদীতে রোজ স্নান! লন্ডনের শীতে সাহেবরাই তো জমে যায়, আর এই লোক নাকি রোজ ভোরে ডুব দিত। হয় লোকটা অতিমানব, নয় ঘটকমশাই অতিমিথ্যুক। দুটোর মধ্যে কোনটার সম্ভাবনা বেশি, সেটা বুঝতে অঙ্ক কষার দরকার হয় না।