মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬Loginবন্ধুদের লেখাকার্যক্রমফিচারখেলাক্যারিয়ারমনোবন্ধুফটো ফিচারবন্ধুসভা সম্পর্কে বন্ধুদের লেখাগল্প বিন্দুর আবর্তেলেখা: মুসাদ্দিকুল ইসলামপ্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫: ১১ জলরংচিত্র: এআই/বন্ধুসভাসকালে ঘুম ভাঙতেই সারা বাড়িতে একটা শোরগোল লেগে গেল। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে ঘুমাতে যাওয়া অয়নের মেজাজ তখন চড়কগাছে।‘বড় মামির অভ্যাস কি কোনো দিন ঠিক হবে না!’ চরম বিরক্তিতে বিছানা ছেড়ে নিদ্রালস চোখে উঠোনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে অয়ন।

সাত সকালে এত হইচইয়ের কারণ অন্বেষাকে নাকি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফোনে বারবার রিং হচ্ছে, কিন্তু রিসিভ করছে না। এতে মা, ছোট মামি আর মামাদের চেয়ে বড় মামির দুশ্চিন্তাই যেন বেশি। অযাচিত বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি আর পুরো বাড়ি মাথা তোলা তার পুরোনো স্বভাব। যদিও বিষয়টা মোটেও অহেতুক নয়; তবে অয়ন জানে তার বোন কোথায়।

মাঘের শীতের অলস প্রভাতে গ্রামের মেঠো পথ ধরে গন্তব্যহীন হেঁটে চলেছে অন্বেষা। গায়ে কেবল একখানি ধূসর শাল। কুয়াশা মাঠের বুকে এমনভাবে শুয়ে আছে, যেন পৃথিবী তার সমস্ত স্মৃতিকে শুভ্র কাফনে ঢেকে রেখেছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মাড়িয়ে অন্বেষা দ্রুত হাঁটছে সীমান্তর হাত ধরে, প্রচণ্ড নির্ভার আর নিশ্চিন্তে। সম্ভবত এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ সে।

সীমান্তর জীবনে অন্বেষা এসেছিল ঠিক ভোরের প্রথম সূর্যালোকের মতো। নিঃশব্দে, ধীরে অথচ সমস্ত অন্ধকার সরিয়ে। প্রথম দিন তাদের কোনো কথা হয়নি। এরপর দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে গেছে কেবল চোখে চোখ পড়ে। সে সময় সীমান্ত বুঝেছিল, মানুষের সবচেয়ে সুন্দর ভাষা ‘শব্দ’ নয়, বরং নীরবতারও নিজস্ব এক ভাষা আছে, সবাই তা পড়তে পারে না। পছন্দের মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে চমৎকার মুহূর্ত হলো চোখের ভাষায় কথা বলা। দুজন মানুষ অপলক তাকিয়ে থাকে, মুখে কিছু না বলেও কত কিছু বলা হয়ে যায়। অন্বেষার মায়াভরা চোখের চাহনিতে যে আত্মার শান্তি অনুভব হয়, তার কাছে মোনালিসার হৃদয়নিংড়ানো হাসিও তুচ্ছ, বাবর আজমের অনিন্দ্য কভার ড্রাইভও নিতান্তই সামান্য এক সৌন্দর্য।সেই নীরবতা নিয়ে সীমান্ত লিখেছিল—‘নির্জনা নিশীথে নিভৃত নির্মল নির্যাসনয়া নক্ষত্রের নোঙর নাচে নিস্তব্ধ নিশ্বাসনিবিড় নশ্বর নীড়ে নিত্য নন্দননিঃশব্দ নতশিরে নীরবতার নম্র নিবেদন।’

প্রেমে পড়ে যায় সীমান্ত। হৃদয়জুড়ে নেমে আসে ফাগুনের মাতাল হাওয়া। উতলা মন আটকে যায় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। ছোট ছোট কল্পনায় অজান্তেই সেই মানুষটা হয়ে ওঠে তার একান্ত আসক্তি। অশান্ত অনুভূতিগুলো একবার ইচ্ছে করে লুকাতে, আবার পরক্ষণেই চায় অন্তরাত্মার সমস্ত গোপন দুয়ার উন্মুক্ত করে দিতে।সীমান্ত তার ভালোবাসার কথা মুখফুটে বলতে পারেনি। হলুদ খামে মোড়ানো চিঠি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পৌঁছে যায় অন্বেষার হাতে।‘শোনো মিষ্টি মেয়ে,তোমার স্বপ্নগুলোর আবর্তে প্রজাপতির ডানায় আলতো স্পর্শে আমাকে সঙ্গে নেবে? হাসনাহেনার ঘ্রাণ আর ঝিঁঝিপোকার শব্দে পূর্ণিমার চাঁদ হব তোমার আকাশে। শহরের নিয়ন আলোর নিচে প্রস্তর পথ ধরে একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজব দুজন। তুমি পরবে শাড়ি, খোপায় বেঁধে দেব ঝরা বকুলের মালা। নন্দন কাননে ছুঁয়ে যাবে মেঘমল্লার সুর। পূর্ণতার শতদলে কাঁপন তোলা আবর্তময়ী অব্যর্থ দাওয়াই তুমি। মল্লিকার প্রেমাতুর স্পন্দনে রবের তরে তোমার প্রার্থনাতে ভালোবেসে রেখো আমায়।’

লাজুক হাসিতে অন্বেষা বলেছিল, ‘তোমাকে চাওয়ার আকুলতাই আমার ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পূর্ণতা। মানুষকে পাওয়ার চেয়ে তাকে হৃদয়ের অন্তঃপুরে অনন্তকাল অনুভব করা অনেক বেশি সুন্দর।’সীমান্ত কোনো উত্তর দেয়নি। সে জানত ভালোবাসা নদীর মতো। বাইরে যত শান্তই দেখাক, ভেতরে–ভেতরে তার স্রোত পাড় ভাঙে। কখনো বসন্তের পলাশ, কখনো শ্রাবণের অবিরল বর্ষণ, আবার কখনো শীতের শুষ্কতা। তবু সম্পর্কগুলো বেঁচে থাকে ভালোবাসা, সম্মান আর বিশ্বাসে।