আমরা ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছি। তখন আমরা কিশোর। পৃথিবীকে দেখার চোখ ছিল সরল, ভবিষ্যৎ ছিল সামনে, আর বন্ধুত্বের অর্থ ছিল একসঙ্গে থাকা, কথা বলা, হাসিঠাট্টা করা এবং একই সময়ের কিছু স্মৃতি নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখা। তখন কে জানত, সেই সময়ের একজন সহপাঠী একদিন বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নিজের একটি আলাদা জায়গা তৈরি করবে এবং আমাদের জীবন দুজনকে দুই ভিন্ন দেশে নিয়ে যাবে?
কলেজজীবনের পর জীবনের স্রোত আমাদের অনেক দূরে সরিয়ে নেয়। প্রায় ৩৬ বছর কেটে যায়। প্রত্যেকে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তারপর ২০১৭ সালে আবার নতুন করে আমাদের যোগাযোগ শুরু হয়। মনে হয়েছিল, এতগুলো বছর যেন মাঝখানে ছিলই না। পুরোনো বন্ধুত্বের একটি দরজা আবার খুলে গেল।
২০১৮ সালে লন্ডনে তৌফিকের সঙ্গে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা একসঙ্গে কাটানোর স্মৃতিটি আজ বারবার মনে পড়ছে। এত বছর পর দুজন মানুষ যেন আবার নিজেদের কৈশোরের দিনগুলোর কাছে ফিরে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ সময় পাশাপাশি থাকা, গল্প করা, পুরোনো দিনের কথা মনে করা, জীবনের নানা বাঁক নিয়ে কথা বলা, এসবের মধ্যে দিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, সময় অনেক কিছু বদলে দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের পুরোনো বন্ধুত্বের জায়গাটি সহজে বদলায় না। সেই ৪৮ ঘণ্টা তখন হয়তো জীবনের আর দশটি দিনের মতোই মনে হয়েছিল। আজ বুঝতে পারছি, কিছু সময়ের মূল্য আমরা তখন বুঝতে পারি না; সময় চলে যাওয়ার পর স্মৃতিই তার মূল্য আমাদের বুঝিয়ে দেয়।
এরপরও কয়েকবার লন্ডনে তৌফিকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। কখনো সে সেখানে এসেছে, কখনো আমি লন্ডনে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছি। বয়স বেড়েছে, জীবনের অভিজ্ঞতা বেড়েছে, আমাদের দায়িত্ব ও অবস্থান বদলেছে, কিন্তু পুরোনো বন্ধুত্বের সেই পরিচিত অনুভূতিটা কোথাও যেন রয়ে গিয়েছিল।
একবার সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিল। সেই সময় আমি তার সঙ্গে ছিলাম। অসুস্থ একজন বন্ধুর পাশে থাকা, তার চিকিৎসার খবর নেওয়া, কথা বলা কিংবা কখনো শুধু নীরবে পাশে বসে থাকা, এসব মুহূর্তের কোনো হিসাব থাকে না। কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো পরে ফিরে তাকালে আরও গভীর হয়ে ওঠে। আজ তার চলে যাওয়ার সংবাদ শুনে সেই সময়টির কথাও মনে পড়ছে।
পরবর্তী সময়ে নানা কারণে আমাদের যোগাযোগ আবার কিছুটা দূরে সরে যায়। জীবনে কখনো কখনো পরিস্থিতি মানুষকে কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়, অথচ মনের ভেতরের পুরোনো সম্পর্কটি পুরোপুরি মুছে যায় না। আমাদের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছিল। সরাসরি যোগাযোগ আগের মতো নিয়মিত না থাকলেও লন্ডনে তার ছেলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্রে তৌফিকের কিছু খবরও কখনো কখনো আমার কাছে পৌঁছেছে।