একসময় বিশ্বে শিল্প প্রতিযোগিতার একটি সহজ সূত্র ছিল– যে দেশে শ্রম সস্তা, সেখানে কারখানা যাবে। বাংলাদেশ এ বাস্তবতার অন্যতম বড় সুবিধাভোগী। তৈরি পোশাকশিল্প তার বড় উদাহরণ। কিন্তু সেই পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগামী দিনের কারখানায় একজন শ্রমিকের পাশে হয়তো আরেকজন শ্রমিক থাকবে না। থাকবে একটি যন্ত্র, যে একই কাজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা করতে পারবে। সে ক্লান্ত হবে না, ছুটি চাইবে না এবং একই কাজ বারবার করার সক্ষমতা রাখবে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক এখন হিউম্যানয়েড রোবট। এটি মানুষের আকৃতির এমন যন্ত্র, যা মানুষের জন্য তৈরি পরিবেশে মানুষের মতো বিভিন্ন কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে। চীন এই দৌড়ে যে গতি অর্জন করেছে, তা এখন আর শুধু প্রযুক্তি প্রদর্শনীর বিষয় নয়। এটি শিল্পনীতি, উৎপাদন ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
গত মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব রোবট সম্মেলনে প্রায় তিন হাজার রোবোটিক পণ্য প্রদর্শিত হয়। সেখানে কারখানা, গুদাম, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহনসহ নানা ক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার তুলে ধরা হয়। একই সম্মেলনে অনুষ্ঠিত মানবাকৃতির রোবট প্রতিযোগিতায় দুই হাজারের বেশি রোবট অংশ নেয়।
হিউম্যানয়েড রোবটের সাফল্যের গল্প শুনলে আমরা প্রায়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলি। কিন্তু এর পেছনে আরও একটি শক্তিশালী বিষয় আছে– উৎপাদনের সক্ষমতা। একটি মানবাকৃতির রোবট তৈরি করতে প্রয়োজন মোটর, সেন্সর, ব্যাটারি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যান্ত্রিক সংযোগ, চিপ, সফটওয়্যার এবং অসংখ্য সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ। চীনের সুবিধা হলো, এসবের অনেক কিছু তাদের আগে থেকেই রয়েছে। চীন বহু বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প রোবটের বাজার। আন্তর্জাতিক রোবট ফেডারেশনের হিসাবে, ২০২৪ সালে চীনে প্রায় দুই লাখ ৯৫ হাজার শিল্প রোবট স্থাপন করা হয়েছে, যা ওই বছরের বৈশ্বিক স্থাপনের ৫৪ শতাংশ। দেশটিতে চালু শিল্প রোবটের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ হিউম্যানয়েড রোবট চীনের জন্য শূন্য থেকে শুরু করা কোনো শিল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে বিদ্যমান কারখানা, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রকৌশলী, যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার।
২০২৬ সালের বিশ্ব রোবট সম্মেলনে এমনও দেখা গেছে, অত্যাধুনিক বলে প্রদর্শিত একটি রোবট একটি সাধারণ শার্ট ভাঁজ করার কাজেই সমস্যায় পড়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, চীনের রোবট শিল্প এখন প্রদর্শনী ও প্রযুক্তিগত চমক থেকে বেরিয়ে বাস্তব ব্যবসায়িক মূল্য তৈরি করার পরীক্ষায় ঢুকেছে। প্রশ্ন হলো, রোবট কি একজন মানুষের কাজের নির্দিষ্ট অংশ নির্ভরযোগ্যভাবে করতে পারে? তার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কত? কতক্ষণ কাজ করতে পারে? ভুল করলে ক্ষতি কত? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ– রোবটে বিনিয়োগ করলে কারখানার উৎপাদন খরচ সত্যিই কমবে কিনা? এই পরীক্ষায় এখনও বিশ্ব অনেকটা পিছিয়ে।
চীন উৎপাদন ক্ষমতায় এগিয়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত কম্পিউটিং, গবেষণা এবং বিনিয়োগে। আমেরিকার লক্ষ্য অনেকাংশে এমন রোবট তৈরি করা, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট কাজ করবে না; বরং মানুষের নির্দেশ বুঝে পরিবেশ অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ করতে পারবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রও বুঝতে পারছে, শুধু মেধা ও সফটওয়্যার দিয়ে হবে না। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা। এই প্রতিযোগিতা এখন প্রযুক্তির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়েও পরিণত হয়েছে। গত জুলাইয়ে মার্কিন ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন বিদেশে তৈরি কিছু উন্নত রোবটকে নিরাপত্তাজনিত কারণে তার নিষিদ্ধ তালিকায় যুক্ত করে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের রোবট প্রতিযোগিতা একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা।