সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন– এই প্রতিপাদ্য নিয়ে এবারও বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। ফার্মাসিস্টদের বিশ্বব্যাপী সংগঠন আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন-এফআইপি কর্তৃক গৃহীত এ বছরের প্রতিপাদ্য মূলত স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিনিয়ত পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নির্ধারণ করা হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক সম্ভাবনা, অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ফার্মাসিস্টদের দক্ষতা এবং লব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগাতে তাদের আরও বেশি করে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ক্ষমতায়ন করে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। রোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসা পাওয়ার অগ্রাধিকার, স্বাস্থ্যব্যবস্থার রেজিলিয়েন্স এবং সাসটেইনেবিলিটি তথা স্থায়িত্ব নিশ্চিতে ফার্মাসিস্টদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান এ বছরের প্রতিপাদ্যে তুলে ধরা হয়েছে।

উন্নত বিশ্বে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সেবা প্রদানকারী হিসেবে চিকিৎসক, গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, বায়োকেমিস্ট উল্লেখযোগ্য। চিকিৎসকদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতায় প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা গড়ে ওঠে। এর মধ্যে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মূল কাজ হলো যে কোনো রোগীর জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণের গাইডলাইন তৈরি, রোগীকে নিরাপদ উপায়ে ওষুধ প্রদান, ওষুধ সম্পর্কিত বিভিন্ন উপদেশ, ওষুধের কার্যকারিতা কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক ওষুধ চয়ন ও তার ডোজ নির্ধারণে সহায়তা করা। পাশাপাশি হাসপাতালে কোন ধরনের ওষুধ রাখতে হবে, তাদের সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন একজন দক্ষ গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট।

শুধু তাই নয়, মহামারির মতো বিষয়ে সাধারণ মানুষকে জনস্বাস্থ্য, ওষুধ কিংবা সংক্রামক রোগের গতি-প্রকৃতি বিষয়ে সচেতন করতে সহায়তা করেন। তবে আমাদের দেশের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় হাসপাতাল বা ক্লিনিক সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসক ও নার্সকেন্দ্রিক। ফলে রোগ নির্ণয়ে দক্ষ লোকের অভাব, ল্যাবরেটরির স্বল্পতা, রোগীর ওষুধ নিয়ে অব্যবস্থাপনা, ওষুধের দোকান থেকে জনগণের দেদার ওষুধ ক্রয়, ওষুধের অপচয়, ওষুধবিষয়ক জটিলতা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিলম্বিত হওয়া ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন মহামারি মোকাবিলায় চিকিৎসা সরঞ্জাম বিষয়েও ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা না থাকায় নানা ধরনের অনিয়মের খবর হরহামেশা চোখে পড়ে।

আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের হাসপাতালে রোগীর সেবায় সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ার পরিবেশ তৈরি করা আজও সম্ভব হয়নি। হাসপাতালে বর্তমানে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট নিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে, যারা শুধু ওষুধ সংরক্ষণ ও বিতরণের সঙ্গে সংযুক্ত। আশির দশকে দেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের অভাবে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট দিয়ে হাসপাতাল ফার্মেসি পরিচালনার উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল। কালের পরিক্রমায় দেশে এখন ৪০টির বেশি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়মিত বের হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে এসব গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের অর্জিত জ্ঞান হাসপাতাল ফার্মেসিতে কাজে লাগানো যেতে পারে। সাধারণত সব ওষুধই এক প্রকার বিষ। এই বিষের সঠিক প্রয়োগে একজন মানুষ সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। নচেৎ অহেতুক এবং অনিরাপদ ব্যবহারে রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট পাঁচ বছর ওষুধ নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে নির্দিষ্ট মেয়াদে হাসপাতাল কিংবা কমিউনিটি ফার্মেসিতে প্রশিক্ষণ শেষে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। তাই ওষুধ বিষয়ে রোগীকে যথাযোগ্য উপদেশ দিয়ে ওষুধসংশ্লিষ্ট ভুলের পরিমাণ কমিয়ে একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক, নিরাপদ ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজে লাগানো জরুরি। স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক প্রতিষ্ঠান হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগালে জনগণকে ওষুধ-সংক্রান্ত সেবাদানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

ড. মো. আব্দুল মুহিত: অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ই-মেইল: [email protected], [email protected]