মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রবন্ধসাক্ষাৎকারঅনুবাদবই আলোচনানথিপত্রআর্কাইভ প্রবন্ধআলী রীয়াজ এবং মো. আখতারুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা কেন প্রয়োজন?প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ২০: ৪১ সারকথা
এই প্রবন্ধে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা কেন প্রয়োজন, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা বিশ্বজুড়ে প্রচলিত হলেও ওয়েস্টমিনস্টারধর্মী ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সাধারণত এমন সীমার আওতায় থাকেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে একজন প্রধানমন্ত্রী আইনসভা, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বাড়িয়ে ক্ষমতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলতে পারেন। হাঙ্গেরি, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিয়ন্ত্রণহীন দীর্ঘ শাসন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে, বিরোধী মত দমন করে এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সংকুচিত করে। থাইল্যান্ড আট বছরের সীমা কার্যকর করেছে; অন্য দেশগুলোতেও এ নিয়ে উদ্যোগ, বিতর্ক ও ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। প্রবন্ধটির মূল যুক্তি হলো, নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তন জবাবদিহি, দলীয় গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা রক্ষায় সহায়ক। তবে ভোটারের পছন্দ সীমিত হওয়া, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব হারানো এবং নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও বিবেচনা করা জরুরি। তাই সাংবিধানিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে এবং গণতন্ত্র কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কাও হ্রাস পাবে।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা—অর্থাৎ নির্বাহী প্রধানের পদে থাকার সময়কে পূর্বনির্ধারিত মেয়াদে সীমিত রাখার ব্যবস্থা—বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ৯২টি দেশের ওপর মাল্টজের এক গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে মাত্র পাঁচটি দেশ ছাড়া বাকি সব দেশেই নির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমা কার্যকর ছিল (মাল্টজ ২০০৭)। ডিকসন ও ল্যান্ডাউ উল্লেখ করেছেন, ‘বর্তমানে কার্যকর রাষ্ট্রপতিশাসিত ও আধা রাষ্ট্রপতিশাসিত সংবিধানগুলোর ৮০ শতাংশের বেশিতে রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা রয়েছে’ (ডিক্সন ও ল্যান্ডউ ২০২০, ৩৫৯)। ফার্স্টিগ ও অন্যদের গবেষণাতেও অনুরূপ তথ্য উঠে এসেছে; তাঁদের মতে, বিশ্বের ৪৩ শতাংশ সংবিধানে নির্বাহী প্রধানের মেয়াদসীমা রয়েছে (ফার্স্টিগ ও অন্যান্য ২০২০)। ১৭৮৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘতর সময়সীমা বিবেচনা করে গিন্সবার্গ, মেল্টন ও এলকিন্স সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে রাষ্ট্রপতিশাসিত ও আধা রাষ্ট্রপতিশাসিত সংবিধানগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশে রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা ছিল; ২০০৬ সালে কার্যকর সংবিধানগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ৭৫ শতাংশের বেশি (গিন্সবার্গ ও অন্যান্য ২০১১)। তবে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থায় একটি দেশ ছাড়া কোথাও প্রধান নির্বাহী—অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষমতা সুসংহত করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার প্রেক্ষাপটে, তাঁদের মেয়াদসীমা নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা বেড়েছে।
এই গবেষণা প্রবন্ধে পাঁচটি দেশের কেস স্টাডি—হাঙ্গেরি, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ভারত—পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণের পক্ষে যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হাঙ্গেরির সংসদ ২০২৬ সালের ১৫ জুন একটি সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করে, যাতে প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ আট বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। থাইল্যান্ডে ২০০৭ সালে সংবিধানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় পরপর একাধিক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রীদের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠান ক্ষুণ্ন করে দেশকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনা চলছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে দুবার প্রধানমন্ত্রীদের টানা দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকতে দেখা গেছে; তাঁদের কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও তৃতীয় মেয়াদে থাকায় ভারতের গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি (ভি-ডেম) ইনস্টিটিউটের মতে, গত এক দশকে ভারত একটি ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রে’ (electoral autocracy) পর্যবসিত হয়েছে (ভি-ডেম ইনস্টিটিউট ২০২৫, ১৬)।
২০২৬ সালের মে মাসে পিটার মাগিয়ারের নেতৃত্বাধীন তিসা পার্টি অপ্রত্যাশিত বিপুল বিজয় অর্জন করে ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটানোর পর হাঙ্গেরির সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবটি আসে। ১৯৯০-এর দশকের পর একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে সফলভাবে উত্তরণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হাঙ্গেরি ২০১৮ সালের মধ্যে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের একটি ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষেত্রে’ পরিণত হয় (শেপেলে ২০১৮)। অরবানের দীর্ঘ শাসনকাল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বল হয়ে পড়া, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অবনতি এবং নির্বাহী ক্ষমতার অতিমাত্রায় বৃদ্ধি দ্বারা চিহ্নিত।
১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পর গণ–অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকারটি ১১টি কমিশন নিয়োগ করে; এর একটি ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন। কমিশনটি ব্যাপক সংস্কারের সুপারিশ করে (দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫), যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণও ছিল। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার প্রত্যক্ষ সহযোগী দলগুলো ছাড়া এ বিষয়ে একমত হয় যে ‘কোনো ব্যক্তি তাঁর জীবদ্দশায় ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না’ (আলমগীর ও আব্বাস ২০২৫)। ফলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সংলাপের মাধ্যমে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয় (জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ২০২৫)। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ২৫টি রাজনৈতিক দল সনদটিতে স্বাক্ষর করে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫) এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে এটি নাগরিকদের বিপুল সমর্থন পায় (বিএসএস ২০২৬)।