রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬Loginপদার্থবিজ্ঞানপ্রযুক্তিগণিতমহাকাশজীববিজ্ঞানকার্যকারণবিজ্ঞান কল্পগল্পকমিকসবিজ্ঞানরম্যসাক্ষাৎকার ফিচার‘পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু’ বলতে কী বোঝায়, কী ঘটছে এখন রূপপুরের চুল্লিতেইশতিয়াক হোসেন চৌধুরী সহকারী ব্যবস্থাপক, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি...আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬: ৫২ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরের গহিনে প্রথমবারের মতো সফলভাবে সংঘটিত হয়েছে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়াআধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়ে একটি মজার কৌতুক প্রচলিত আছে। এগুলোকে নাকি শুধু একজন মানুষ এবং একটি পোষা কুকুর দিয়েই চালানো সম্ভব! মেইন কন্ট্রোল রুমে মানুষের কাজ হলো কুকুরটিকে খাওয়ানো, আর কুকুরের দায়িত্ব হলো সেই মানুষটিকে কামড়ে দেওয়া; যাতে মানুষটি ভুলেও স্বয়ংক্রিয় কন্ট্রোল প্যানেলের কোনো কিছুতে হাত দেওয়ার চেষ্টা না করে!

কৌতুকটির মধ্যে আদৌ কোনো ‘সত্যতা’ আছে কিনা, সে সম্পর্কে সবেচেয়ে ভালো বলতে পারবেন স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর কন্ট্রোল রুমে কাজ করা তুখোড় অপারেটররা। তবে আমাদের দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণ প্রকল্পের বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত থাকার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি— কৌতুকটির আড়ালে যে মাত্রার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, বাস্তবতার সঙ্গে এর ব্যবধান সামান্যই। অত্যাধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যেন মানুষের উদ্ভাবনী সক্ষমতার এক মূর্ত প্রতীক।

এই লেখা যখন লিখছি তখন আমাদের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট স্পর্শ করেছে এক অনন্য মাইলফলক। এর রিঅ্যাক্টরের গহিনে প্রথমবারের মতো সফলভাবে সংঘটিত হয়েছে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া। কিছুদিন আগেই সেখানে একে একে বসানো হয়েছিল ১৬৩টি ইউরেনিয়াম জ্বালানি দণ্ড বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। এগুলো এবং আনুষঙ্গিক সব সিস্টেম হরেক রকম নিরাপত্তা মানদণ্ড ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সফলভাবে উৎরে যাওয়ার পরই এই স্পর্শকাতর ধাপের কাজ শুরু হয়। পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পর দেশবাসীর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দিন গুনতে শুরু করেছিলাম। কবে আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! অপেক্ষার প্রহর অবশ্য খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। রোববার, দুপুর ৩টা ৩৪ মিনিটে আমাদের দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ঘটানো হয় পারমাণবিক বিক্রিয়া। এই সাফল্যের মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের পথে আমরা যেন আক্ষরিক অর্থেই পৌঁছে গিয়েছি হাত ছোঁয়ার দূরত্বে।

সায়েন্স ফিকশন বই বা মুভির বদৌলতে ‘ক্রিটিক্যালিটি’ শব্দটা শুনলে অনেকেই যেন খানিকটা ভয় পেয়ে যান। এজন্য অবশ্য তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। রূপালি পর্দায় হরহামেশাই বলতে শোনা যায়, ‘দ্য রিঅ্যাক্টর ইজ গোইং টু বি ক্রিটিক্যাল!’। এরপর শুরু হয় হুলুস্থুল। যে যেদিকে পারে, সেদিকে পালানোর চেষ্টা করে। কেউ কেউ অবশ্য ভাগ্যকে মেনে নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন প্রলয়ংকারী বিস্ফোরণের। তবে ঠিক সেই সময়ে দৃশ্যপটে ত্রাণকর্তা হিসেবে আগমন ঘটে মূল চরিত্রের। অসাধারণ দক্ষতায় বা মাঝেমধ্যে ভাগ্যের জোরে একদম শেষ মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে দেখা যায় খানিক আগের সেই ভয়ংকর পরিস্থিতিকে। এসবে কোনো সমস্যা না থাকলেও, ঝামেলা পাকায় মূলত ওই সংলাপটি। এটি ক্রিটিক্যালিটি সম্পর্কে মানুষকে ভুল বার্তা দেয়।

ক্রিটিক্যালিটি বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে ফিশন এবং চেইন বিক্রিয়া সম্পর্কে। খুব সহজ করে বললে, ফিশন হলো এক ধরনের ভাঙন বিক্রিয়া। এতে একটি ভারী মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াস ভেঙে গিয়ে দুইটি অপেক্ষাকৃত ছোট নিউক্লিয়াস তৈরি করে। তখন উৎপন্ন হয় আরও কয়েকটি নিউট্রন এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি। এই বিষয়টি ঘটতে পারে মূলত দুইভাবে—স্বতঃস্ফূর্ত বা বাহ্যিক আঘাতের প্রভাবে। প্রথম কৌশল শতভাগ প্রাকৃতিক। এতে মূল নিউক্লিয়াসটি এতটাই অস্থিতিশীল থাকে যে, এটি কোনো কারণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুই বা ততোধিক ছোট নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয়ে যায়। সাধারণত অতিভারী কৃত্রিম মৌলগুলো, যেমন ক্যালিফোর্নিয়াম-২৫২-এর ক্ষেত্রে এরকম প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে ইউরেনিয়ামের মতো নিউক্লিয়াসকে যদি বাইরে থেকে আসা কোনো নিউট্রন দিয়ে আঘাত করা হয়, তবে সেটি শোষিত হয়ে প্রথমে আত্মপ্রকাশ করবে একটি যৌগিক নিউক্লিয়াস। অতঃপর হয় সেটি গামা রশ্মি বিকিরণের মাধ্যমে ভারসাম্য অবস্থায় পৌঁছাবে, নয়তো ভেঙে গিয়ে রূপান্তরিত হবে দুইটি আলাদা ছোট নিউক্লিয়াস ও কয়েকটি নতুন নিউট্রনে। দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায় যে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়, তার সিংহভাগই ফিশন ফ্র্যাগমেন্টসের গতিশক্তি হিসেবে অবমুক্ত হয়।

ফিশন চেইন বিক্রিয়ার মূলনীতিবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য রিঅ্যাক্টরে অনিয়মিতভাবে ফিশন ঘটালে চলে না। এমন ব্যবস্থা নিতে হয়, যেন প্রক্রিয়াটি একবার শুরু হলে অবিরাম চলতেই থাকে। এই ঘটনার নাম চেইন বিক্রিয়া। মাত্রই বলেছি, প্রতিটি ফিশন বিক্রিয়া শেষে আবির্ভূত হয় কয়েকটি নিউট্রন। এরাও যদি পরের ধাপের ফিশন বিক্রিয়ায় অংশ নেয়, তাহলে আবারও পাওয়া যাবে একগুচ্ছ নিউট্রন। এই ধারা চলমান থাকলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই বাড়বে এই নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার পরিধি। উৎপন্ন হতে থাকবে বিপুল পরিমাণ শক্তি।