পদ্মার চরে কোথায় কোন গাছ রোপণ করা হবে, আবহাওয়া ও বন্যার ধরন অনুযায়ী মিশ্রচাষ, বা কোন বীজ কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে– এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব থাকে নারীর হাতে। অথচ কৃষকের তালিকা, জমির দলিল আর ক্ষতিপূরণের কাগজে তিনি অনুপস্থিত। লিখেছেন লাবণী মণ্ডল ----------------------------------
রান্নাঘরের গা ঘেঁষে একটা কুঠুরি। ভেতরে আলো কম, মাটির গন্ধ বেশি। তাকে সারি সারি বীজ। কোনোটা কাচের বয়ামে, কোনোটা কাপড়ের পুঁটলিতে, কোনোটা মাটির হাঁড়িতে। প্রতিটির গায়ে কাগজ সাঁটা; তাতে হাতে লেখা বীজের নাম।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পদ্মার চরের এ বাড়িতে বীজ কে সংরক্ষণ করেন–জানতে চাইলে বাড়ির আমেনা বেগম (৩৫) হাসলেন। বললেন, ‘এগুলা তো বাড়ির মেয়ে-বউদেরই কাজ। আশপাশে যত গাছ দেখতাছেন, যত সবজি দেখতাছেন, সব প্ল্যান আমাদের।’
এক পাক ঘুরতেই বাস্তবতা মিলে যায়। বেড়ায় করলা আর বরবটির লতা। ক্ষেতে টমেটো, বেগুন, ডাঁটা, মরিচ। নিজ থেকে গজানো নোনতা আর বতুয়া শাক আগাছা ভেবে তুলে ফেলা হয়নি; রাখা হয়েছে পাতে তোলার জন্য। বিলের পাড় ধরে তাল আর সুপারির সারি; যাতে শিকড় মাটি আঁকড়ে রাখে, পাড় সহজে না ভাঙে। একটা ফল গাছও বাজারের চারায় নয়।
কোন ফসলের পাশে কোন ফসল বসবে, কোন মৌসুমে কী বোনা হবে, পরের বছরের জন্য কোন বীজ তুলে রাখতে হবে–এসব ঠিক করেন এ বাড়ির নারীরা। কৃষিবিজ্ঞানে একে বলে মিশ্র ফসলের পরিকল্পনা। চরে এর যুক্তি সোজা। বন্যায় এক ফসল গেলে আরেকটা টিকে যায়। সারাবছর হাঁড়িতে কিছু না কিছু ওঠে। ঝুঁকি ভাগ করার এই কৌশল তারা শিখেছেন নদীর কাছ থেকে, কোনো প্রশিক্ষণ থেকে নয়। অথচ জমির দলিলে, কৃষকের তালিকায়, ভাঙনের ক্ষতিপূরণের কাগজে এই নারীদের নাম নেই।
শ্রম আছে, নাম নেই আমেনার দিন শুরু হয় আলো ফোটার আগে। খড়ের পালা ভাঙা, উঠানে ধান মেলে দেওয়া, বৃষ্টির পর চারার গোড়া থেকে পানি সরানো, খড় বিছিয়ে মাটি ঢাকা, গরুর খাবার জোগানো, তিন বেলার রান্না। বর্ষা এলে কাজ বাড়ে দ্বিগুণ। উঠান ডোবে, পথ ডোবে। বীজ-চাল তুলতে হয় উঁচুতে। পানি নামলে কাদা ঠেলে আবার চারা বসানো। ক্লান্ত লাগে না? আমেনা আর তাঁর শাশুড়ির উত্তর একই–‘এইটাই তো আমগো কাজ।’