নদীর পাড় ঘেঁষে ছিল সেলিনাদের ছোট্ট টিনের ঘর। মাটির উঠান, দুটো নারকেলগাছ, একটা আমড়াগাছ আর পেছনে বাঁশঝাড়। বাবা নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাত। ঘরে অভাব ছিল, সুখও ছিল।সেলিনার পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। তবে হাতের কাজে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। নকশিকাঁথা, পাটের ছিকা, রুমালে ফুল তোলা—সব কাজেই সে পারদর্শী ছিল। তার তৈরি আমড়ার আচার আর নারুর সুনাম ছিল এলাকাজুড়ে।

গাঁয়ের উত্তর পাড়ায় ছিল ফিরোজদের বাড়ি। বয়সে সেলিনার সমান। নদীতে মাছ ধরা কিংবা অন্যের জমিতে কাজ করা ছিল তার পেশা। সুযোগ পেলেই সেলিনাদের বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করা ছিল নেশা।প্রথম প্রথম ফিরোজকে দেখে সেলিনা বিরক্ত হতো। কিন্তু কখন যে ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটার প্রতি সেই বিরক্তিই মায়ায় পরিণত হলো, তা সে নিজেও জানে না।

দুপুরে নদীর ধারে বসে ফিরোজ বাঁশি বাজাত। সেলিনা কলসি কাঁখে পানি আনার ছলে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।একদিন বাঁশি থামিয়ে ফিরোজ বলল,—পানি নিতে এসেছ?সেলিনা মুচকি হেসে বলল,—না।—তাহলে?—তোমার বাঁশি শুনতে।সেলিনার সেই হাসি ফিরোজের মনে আঠার মতো গেঁথে গেল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদী বদলে যাচ্ছিল।নদী থেকে বালু তোলার জন্য একের পর এক ড্রেজার আসতে থাকল। জল ঘোলা হয়ে উঠল। নদীর তলায় তৈরি হলো গভীর গর্ত।একদিন নদীর দিকে তাকিয়ে সেলিনার বাবা বলল,—নদীটা আর ভালো নেই রে মা।সেলিনা হেসে বলল,—নদী আবার খারাপ হয় নাকি?বৃদ্ধ বলল,—মানুষ যখন নদীর স্বভাব বদলাইতে চায়, নদীও তখন তার জবাব দেয়।ফিরোজও ভয় পেয়ে গিয়েছিল।—এভাবে বালি তুললে পাড় টিকবে না, সেলিনা।—আমাদের বাড়িও?ফিরোজ চুপ থেকে বলল,—হয়তো।সেলিনার মুখ মলিন হয়ে গেল। তাকে স্বাভাবিক করার জন্য ফিরোজ মৃদু হেসে বলল,—ভয় পাও কেন? তোমার জন্য আমি আছি না!সেলিনা কথাটা বিশ্বাস করেছিল।

কিন্তু নদী মানুষের প্রতিশ্রুতি বোঝে না।এক সকালে নদীর পাড়ে সরু ফাটল দেখা দিল। দুপুরে ফাটল চওড়া হলো। নারকেলগাছ দুটো নদীর দিকে ঝুঁকে পড়ল। পরদিন আমড়াগাছের পাশের মাটি ধসে গেল।কাঁদতে কাঁদতে সেলিনা বলল,—ফিরোজ, নদী কি সত্যিই আমাদের বাড়ি কেড়ে নেবে?ফিরোজ কোনো উত্তর দিতে পারল না।

কয়েক দিনের মধ্যেই ঘর, উঠান, নারকেলগাছ, আমড়াগাছ—সব নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেল।সেলিনাদের আশ্রয় হলো দূরের এক চরে। অজানা অচেনা নতুন চরের নতুন জীবনে সংসারের অভাব বেড়ে গেল। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ল। সেলিনার নকশিকাঁথা, আচার, নারুর কদরও কমে গেল।গ্রাম ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরোজের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। কারণ, সেলিনারা যখন গ্রাম ছেড়েছিল, তখন ফিরোজ পাশের জেলায় ধান কাটতে গিয়েছিল। ফিরে এসে শুনল—সেলিনারা চলে গেছে। কোথায় গেছে, কেউ জানে না। যাওয়ার সময় সেলিনারাও জানত না, শেষ পর্যন্ত কোথায় তাদের আশ্রয় হবে। তারপরেও ফিরোজ অনেক খুঁজেছিল। কিন্তু পায়নি কোথাও।