পাশের বাড়ির একটি গরু অসুস্থ হলে দ্রুত সেটি জবাই করা হয়। সেই গরুর মাংস কাটাকাটি করেছিলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার গাছেরদিয়াড় গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম। তখনও তিনি বুঝতে পারেননি অসুস্থ পশুটির সংস্পর্শে আসার কারণে তিনি সংক্রামক ব্যাধি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হতে পারেন। গরু জবাইয়ের দুই-তিন দিন পর রফিকুলের হাত ও আঙুলে ছোট ছোট গুটি ও ফোসকার মতো দাগ দেখা দেয়। কয়েক দিনের মধ্যে সেগুলো বড় হয়ে ঘায়ে পরিণত হয় এবং ক্ষতের মাঝখানটা কালো হতে শুরু করে। সেই সঙ্গে দেখা দেয় তীব্র জ্বর ও শরীর ব্যথা। প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও ক্ষত বাড়তে থাকায় তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তিনি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অসুস্থ গরু জবাইয়ের পর মাংস কাটাকাটি ও ধোয়ামোছা করেছিলাম। কয়েক দিন পর হাতে গুটি উঠে ঘায়ে পরিণত হয়। এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।’ রফিকুলের মতো অনেকেই একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার পর্যন্ত চলতি মাসের ২৩ দিনে অন্তত ৪৭ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের বড় অংশই অসুস্থ গবাদি পশু জবাই, কাঁচা মাংস কাটাকাটিতে যুক্ত ছিলেন।
এর আগে উপজেলার কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকা, বিশেষ করে ভারত সীমান্ত-সংলগ্ন গ্রামগুলোকে অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে এই রোগী হাসপাতালে আসছেন। এতে মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চর্মরোগ চিকিৎসক ডা. এমদাদুল হক টোটন বলেন, সারা বছরই কমবেশি অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসেন। তবে সম্প্রতি সংক্রমণের মাত্রা বেড়েছে। আগে নির্দিষ্ট কিছু গ্রামকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এখন বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগী আসছেন। সংক্রামক এই রোগ নিয়ন্ত্রণে অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
চিকিৎসক ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। কোনো পশুর শরীরে অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অন্যদিকে মানুষের শরীরে গুটি, ফোসকা বা কালো ক্ষত দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অসুস্থ পশু গোপনে জবাই বন্ধের দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাটবাজার ও গ্রামগুলোয় অসুস্থ পশু জবাই ও মাংস বিক্রির প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই বাজারগুলোয় পশু বিক্রি ও জবাই প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব বলেন, অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ঠেকাতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে গবাদি পশুকে টিকা দেওয়া ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। তবে অসুস্থ পশু গোপনে জবাই ও বিক্রি করার প্রবণতা মাঠ পর্যায়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাস বলেন, পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে মালিকরা সেটি কম দামে বিক্রি কিংবা জবাই করে ফেলেন। অসচেতনতার কারণে ওই পশুর মাংস কাটাকাটি ও ধোয়ামোছা করতে গিয়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউ যাতে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য সচেতনতার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসেই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দুটি গ্রামে ৩৪ জন অ্যানথ্রাক্স রোগী শনাক্ত হয়েছেন। অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটি করার পর তাদের শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়। পরবর্তী সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাদের অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।