বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি পাঠক দুর্গোৎসবের আবাহনে শরৎ, স্মৃতির অলিন্দে চরনারচরলেখা: অনজন কুমার রায়প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২: ৫৯ দুর্গাপূজাফাইল ছবিকল্পনাবিলাসী মন কখন যে পুজোর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে অচেনা এক গন্তব্যের পথে পা বাড়ায়, কিংবা মনের অগোচরে ভেসে বেড়ানো ছন্দময়তার কাব্যিক ধারা কখন যে বাস্তবের স্পর্শ পেতে চায়, তা বোধ হয় মন নিজেও জানে না। শরতের আগমনী বার্তা আমাকে বরাবরই একটু বেশি স্নাত করে। শরতের আকাশ, বাতাসের মৃদুমন্দ দোলা, কাশফুলের শুভ্রতা আর শিউলির গন্ধে মিশে থাকে এক অনির্বচনীয় আকুলতা, যেন প্রকৃতি নিজেই তার সব স্নিগ্ধতা উজাড় করে দিয়ে মনকে কোথাও হারিয়ে যেতে আহ্বান জানায়।

বছর কয়েক আগে, শারদপ্রাতে দুর্গাপূজার আমন্ত্রণে চরনারচরে (সুনামগঞ্জ) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। মুড়ির টিন বাসের দেখা না মিললেও যে গাড়িগুলোর দেখা পেলাম, তাতে মনে হয়েছিল পঞ্চাশ-ষাট বছরের পুরোনো কোনো যানবাহনের স্মৃতিচিহ্নে চড়ে বসেছি। এক-দেড় ঘণ্টার নিরস ভ্রমণ নয়, টানা তিন-চার ঘণ্টার যাত্রা ক্লান্তির একঘেয়েমিতে আচ্ছন্ন করে তুলেছিল।

সেখানে প্রকৃতি যেন ক্লান্ত পথের শেষে বিস্ময় জমিয়ে রেখেছিল। দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের মৃদু আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি, ধূপের ধোঁয়া, পূজামণ্ডপ আর সন্ধ্যার আরতির আলোয় জেগে ওঠা দেবীমূর্তির মুখ—সবকিছু মিলিয়ে শরৎ যেন তার নিজস্ব ভাষায় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা শোনায়। সেই বার্তার মধ্যে যেমন ছিল ভক্তির নিবিড় আবেশ, তেমনই ছিল আনন্দ, মিলন আর অচেনা কোনো মায়ায় জড়িয়ে পড়ার আকর্ষণ। অথচ মণ্ডপের কোলাহল পেরিয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়ালেই ছিল অন্য এক জগৎ—নীরব, নিস্তব্ধ অথচ অপার মায়ায় পূর্ণ। একদিকে উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য, অন্যদিকে নদীর নীরবতা; এই দুই বিপরীত আবহের মেলবন্ধনেই চরনারচরে পূজার দিনগুলো আমার কাছে অনন্য হয়ে উঠেছিল।

নদীর বুকে ভেসে চলার মধ্যে মুক্তি মেলে। তাই চাঁদনি রাতে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো কিংবা রাত জেগে যাত্রাপালা দেখতে যাওয়ার দিনগুলো ছিল এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। সেখানে সুয়োরানি আর দুয়োরানির গল্প, পরিচিত সংলাপের পুনরাবৃত্তি, দীর্ঘ অভিনয়ের পরম্পরা, যার নিজস্ব এক ভাষা আছে এবং যা কেবল অনুভবের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়! নদীর বুকে রাতের ভ্রমণ, নৌকার দুলুনি, অন্ধকারে ছুটে চলা, আর পরিচিত মানুষগুলোর সান্নিধ্য—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটুকু আমার স্মৃতির পাতায় আলাদা হয়ে রইল।

কোনো ভ্রমণের সৌন্দর্য কেবল গন্তব্যের দৃশ্যপটে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার প্রকৃত পূর্ণতা আসে সেই পথের সঙ্গীদের কাছ থেকে। চরনারচরের এই যাত্রাও আমার কাছে তেমনই এক অভিজ্ঞতা। আমরা যাঁরা একসঙ্গে পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছেছিলাম, তাঁদের প্রত্যেকের উপস্থিতি এই ভ্রমণের স্মৃতিতে আলাদা আলাদা রং মিশিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, চলার পথে কথাবার্তা, পূজার আনন্দ ভাগ করে নেওয়া—সবকিছুর মধ্যেই যেন তৈরি হয়েছিল এক আত্মিক বন্ধন।

পূজায় শত ব্যস্ততার মাঝেও শতভাগ সাদাসিধে এই মানুষগুলোর স্নেহময় উপস্থিতি যেন গোটা বাড়িটাকেই এক মায়ার আবরণে জড়িয়ে রেখেছিল। বয়সের ভার স্পর্শ করলেও স্নেহের স্বতঃস্ফূর্ততা একটুও ম্লান হয়নি। তাঁদের আচরণে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা, ছিল না আপন করে নেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন; ছিল অকৃত্রিম মমতা। মাসিমা ও শাশুড়ি মহাশয়া যেন সেই সহজ, নির্মল ভালোবাসারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।