দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। আবার খোদ পোশাক খাতও ভুগছে বৈচিত্র্য সংকটে। এ খাতের মোট রপ্তানি আয়ের এক-তৃতীয়াংশ আসে বটমওয়্যার অর্থাৎ ট্রাউজার, শর্টস ও স্কার্ট থেকে। টি শার্ট থেকে আসে ১৯ শতাংশের মতো। সোয়েটার রপ্তানি থেকে ১৩ শতাংশ। এই তিন পণ্য থেকে পোশাকের রপ্তানি আয়ের ৫৫ শতাংশ আসে। প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পণ্যবৈচিত্র্যে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে মাত্র চার পণ্যে এই অতিনির্ভরতা রপ্তানি খাতের ঝুঁকি নির্দেশ করে।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাকের অবস্থান মজবুত। পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তবে রপ্তানি-ঝুড়ির কাঠামোগত বিশ্লেষণের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। বৈশ্বিক বাজারে উচ্চমূল্যের, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক কিংবা ফ্যাশনেবল পোশাকের চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও বাংলাদেশ এখনও তুলাভিত্তিক মৌলিক মানের পণ্যে নির্ভর করছে। উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তরসহ পণ্যের বৈচিত্র্য এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রা থেকে বহুদূর।

একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে কৃত্রিম তন্তুর বিশ্ববাজারে দুর্বল উপস্থিতি দেশের পোশাক খাতকে এক বহুমুখী কাঠামোগত চাপের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রণোদনা ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের নানান উদ্যোগ–কোনো দাওয়াইয়ে যেন দূর হচ্ছে না ব্যাধি। একক খাত হিসেবে তৈরি পোশাক ও নির্দিষ্ট পণ্যে এ খাতের নির্ভরতা আরও কিছুটা বেড়েছে। পোশাকেও মৌলিক পণ্যের আধিপত্য চলছে। বিশ্ববাজার ক্রমেই আরামদায়ক, প্রযুক্তিনির্ভর ও নন-কটন কাপড়ের দিকে ঝুঁকছে। বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যের ৭৬ শতাংশ এখন নন-কটন ফাইবারভিত্তিক বিশেষ করে আউটারওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, অ্যাথলেইজার ও স্পোর্টসওয়্যারের বাজার পুরোটা কৃত্রিম তন্তুর ওপর নির্ভরশীল। বাকি ২৪ শতাংশ তুলাভিত্তিক। বাংলাদেশের চিত্র ঠিক উল্টো। দেশে প্রস্তুতকৃত পোশাকের ৬৮ শতাংশ এখনও সুতিভিত্তিক, মাত্র ২৭ শতাংশ ম্যান-মেইড ফাইবার ভিত্তিক।

রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশ ৫ পণ্যে ২০২৫ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় আসে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৩৪ শতাংশ এসেছে একটি মাত্র শ্রেণি থেকে বটমওয়্যার থেকে। এ ক্যাটেগরিতে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে টি-শার্ট ও ভেস্ট। মোট রপ্তানি আয়ে হিস্যা ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৭ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। সোয়েটার ও কার্ডিগানের হিস্যা ১৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। রপ্তানি আয়ের পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। পোশাকের অন্যান্য পণ্যের মধ্যে অন্তর্বাস ও নাইটওয়্যারের হিস্যা ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। রপ্তানি আয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। এই চার ক্যাটেগরির দখলে রয়েছে মোট রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, তৈরি পোশাকের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শার্টের রপ্তানি মোটামুটি ভালো। গত পঞ্জিকা বছর পোশাকের মোট রপ্তানিতে পণ্যটির হিস্যা ছিল ৮ শতাংশের মতো। রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। এসব পণ্যকে মৌলিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত বছর মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের ৮১ দশমিক ২৭ শতাংশ এসেছে পাঁচটি মৌলিক পণ্য থেকে। বাকি ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ এসেছে পোশাকের অন্যান্য ক্যাটেগরি থেকে। উচ্চমূল্যের পোশাকের মধ্যে শিশুদের পোশাকের হিস্যা ছিল ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। রপ্তানি আয় হয়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। আউটারওয়্যার (জ্যাকেট-কোট) থেকে এসেছে ১ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানিতে হিস্যা ছিল ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ব্লাউজ রপ্তানি থেকে রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম। হিস্যা ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। টেকনিক্যাল ওয়্যার থেকে ৭৫ লাখ ডলার। হিস্যা ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। গত বছর স্পোর্টসওয়্যার বা অ্যাকটিভওয়্যার থেকে এসেছে মাত্র ৪৬ কোটি ডলার। রপ্তানিতে হিস্যা দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৭ শতাংশ। স্যুটের অংশ সবচেয়ে কম, দশমিক শূন্য ৩৩ শতাংশ। এ প্রবণতা বলে দেয় যে, ফরমাল ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও প্রায় অনুপস্থিত।

রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমছে বৈচিত্র্য সংকটসহ আরও কিছু কারণে গত তিন বছরের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হারও বলে দিচ্ছে খাতটির গতি ধীরে ধীরে মন্থর হয়ে আসছে। ২০২৩ সালে ৩৫ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি ২০২৪ সালে দাঁড়ায় ৩৮ দশমকি ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধির গতি একেবারেই স্তিমিত হয়ে গেছে। মোট রপ্তানি ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশে।

প্রতিযোগীদের তুলনায় যেখানে পিছিয়ে বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হলেও শীর্ষ প্রতিযোগীদের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনও বেশ পিছিয়ে। ২০২৫ সালে চীনের পোশাক রপ্তানি ছিল ১৫১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে উচ্চমূল্যের পণ্যে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম। গত বছর ভিয়েতনামের মোট বস্ত্র-পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলারে, আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ভিয়েতনামের শক্তির জায়গা মূলত স্পোর্টসওয়্যার, আউটারওয়্যার, টেকনিক্যাল জ্যাকেট ও পারফরম্যান্স ফেব্রিক-নির্ভর পণ্য। ঠিক এই ক্যাটেগরিগুলোতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। নাইকি, অ্যাডিডাস, নর্থ ফেস ও লুলুলেমনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর অনেক পণ্যের উৎপাদন ভিয়েতনামে কেন্দ্রীভূত, যা দেশটির প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতার প্রমাণ।