তিতাস নদীর পাড়ে এক গ্রামে মালোদের বাস। এপাড়ার ছেলে থেকে বুড়ো, সবাই মাছ ধরার ওপরেই বেঁচে থাকে। নারীরা জাল বোনে, ছেলেরা উঠোনজুড়ে খেলে। একটু বয়স বাড়লেই নৌকায় গিয়ে মাছ ধরতে শেখে। কারও নিজের নৌকা আছে, কেউ অন্যের নৌকায় যায়। মাছ ধরা, মাছ বিক্রি করা, জাল বোনা আর নিজেদের কিছু উৎসব পালন, এভাবেই চলতে থাকে জীবন।

উর্বর তিতাস এদের নিরাশ করেনি। হাসি-কান্না, জন্ম-মৃত্যু, আনন্দ-বিষাদ, সবকিছুরই সাক্ষী এই নদী। কতকাল ধরে এসব সে নীরবে দেখেছে। দেখেছে আর বয়ে চলেছে। কত মানুষের গল্প নিজের বুকের মধ্যে গিলে নিয়েছে।

এই মালোপাড়ারই বাসিন্দা কিশোর, সুবল ও বাসন্তী। ওরা এই সমাজের সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া মানুষের প্রতিনিধি। বয়স বাড়লে দুই বন্ধু কিশোর ও সুবল তিতাস পাড়ি দিয়ে মাছ ধরতে যায় অন্য এক গ্রামে। বহু দিনের পথ। ঝড়-তুফান পেরিয়ে যে গ্রামে তারা যায়, সেখানে এক মেয়েকে দেখে কিশোরের মনে ধরে যায়। সেখানেই বিয়ে হয় তার।কিন্তু সেই গ্রামের পাট চুকিয়ে ফেরার রাতেই ডাকাতের কবলে পড়ে কিশোরের নৌকা। ডাকাতেরা তার নববধূকে নিয়ে যায়। যাকে দুই দণ্ড ভালো করে দেখার সুযোগও সে পায়নি, তাকেই হারিয়ে ফেলে কিশোর।

এদিকে মালোদের উৎসবের এক প্রচলিত রীতি মেনে বাসন্তীর সঙ্গে সুবলের বিয়ে হয়। কিন্তু কিশোর তখন ধীরে ধীরে উন্মাদ হয়ে যায়। বিয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই বিধবা হয় বাসন্তী, সুবলের বউ।অভাবী সুবল, কিশোর, তাদের পরিবার, সবাই যেন একই অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকে। যে বুড়ো বাবা-মায়ের এই বয়সে ছেলে আর ছেলের বউয়ের দেখাশোনা পাওয়ার কথা, সেই বুড়ো বাবাকেই শেষ পর্যন্ত পাগল ছেলের জন্য কপাল চাপড়ে কাঁদতে হয়।মালোদের ছেলে মরল, কেউ পাগল হলো, কেউ–বা বেঁচে রইল। কিন্তু কার কী এসে যায়? এভাবেই তো মালোদের দিন চলে।

এই সুবল, কিশোর, বাসন্তী, উদয়তারা, বনমালী সবাই যেমন মালোপাড়ার প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি, তেমনই হয়তো আমাদের সমাজেরই। ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মতোই এরাও একটা জালে আটকা, একটা গোলকধাঁধায় আটকা! সে ফাঁদ কেটে কেউ বেরোতে পারে কি?

একদিন এক বিধবা ছোট্ট ছেলে অনন্তের হাত ধরে এসে হাজির হয় এই গ্রামে। সেই মা মালোদের ঘরে আশ্রয় পায়। কারণ, তার নিজের ঘর নেই। আগে-পরে কেউ নেই। ডাকাতের ভয়ে একসময় নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে। এত দিন এক বুড়ো-বুড়ির আশ্রয়ে ছিল। এবার আশ্রয়ের খোঁজে এসে ওঠে তিতাসের পাড়ে।