ক্রোয়েশিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৩৪৭ ধরতে হবে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ট্যাক্সি এগিয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা পথ ধরে। কখনো সরু অলিগলি, কখনো পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা ঘরবাড়ি, আবার কখনো চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে সবুজ পাহাড়ের বিস্তৃত দৃশ্য। ইউরোপের অনেক শহরই দেখেছি, কিন্তু সারায়েভোর সৌন্দর্যে রয়েছে এক স্বতন্ত্র মাধুর্য। পাহাড় আর নগরজীবন এখানে পরস্পরের পরিপূরক। শহরের গায়ে লেগে আছে অটোমান ঐতিহ্য, মসজিদের মিনার আর ইউরোপীয় স্থাপত্যের ছাপ। আবার এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে যুদ্ধ, অবরোধ ও মানুষের অসীম দুর্ভোগের ইতিহাস।
শহর ছেড়ে বিমানবন্দরের দিকে এগোতে এগোতে নগরের কোলাহল ক্রমে পেছনে পড়ে রইল। অল্প সময়ের মধ্যেই সারায়েভোর সঙ্গে একধরনের মায়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিদায়ের মুহূর্তে সেই মায়াই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
বিমানবন্দরে পৌঁছে বোর্ডিং পাস নিয়ে সিকিউরিটি আর ইমিগ্রেশন পেরিয়ে চলে গেলাম ক্রোয়েশিয়া এয়ারলাইনসের এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জে। ইউরোপের এই ছোট এয়ারলাইনস আবার বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর জোট স্টার অ্যালায়েন্সের (Star Alliance) সদস্য। বিশ্বব্যাপী স্টার অ্যালায়েন্সের যেকোনো এক্সিকিউটিভ ভিআইপি লাউঞ্জে আমার প্রবেশাধিকারের সুযোগ থাকার সুবাদে সারায়েভো বিমানবন্দরের এই লাউঞ্জে কিছুক্ষণ বিশ্রাম, খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি বোর্ডিংয়ের জন্য অপেক্ষা।
এক ঘণ্টার কম সময়ের এই আকাশযাত্রায় সময়মতো ছোট বিমানটি উড়াল দিল। বসনিয়া ছেড়ে অবশেষে নিচে ভেসে উঠল ক্রোয়েশিয়ার ভূখণ্ড। পাহাড়ি দৃশ্য পেছনে ফেলে পৌঁছে গেলাম জাগরেবের ফ্রাঞ্জো তুদমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ক্রোয়েশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতাপরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম রাষ্ট্রনায়ক ফ্রাঞ্জো তুদমানের নামানুসারে বিমানবন্দরটির নামকরণ। অবশ্য ক্রোয়েশিয়ার প্রধান আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দর রাজধানী জাগরেবে অবস্থিত হওয়ার কারণে এটি জাগরেব বিমানবন্দর নামেও পরিচিত।
বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে শহরের দিকে যেতে যেতে প্রথমেই চোখে পড়ল নগরটির ভিন্ন চরিত্র। সারায়েভো যেন পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নেওয়া এক ঐতিহাসিক নগরী; আর জাগরেবের পরিচয় প্রশস্ত রাস্তা, সবুজ পার্ক, পুরোনো ইউরোপীয় স্থাপত্য এবং আধুনিক নগরজীবনের শান্ত সহাবস্থানে।
ক্রোয়েশিয়া হচ্ছে স্লোভেনিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং মন্টিনেগ্রোবেষ্টিত দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। দেশটির আয়তন প্রায় ৫৬ হাজার ৫৪২ বর্গকিলোমিটার এবং সরকারি মুদ্রা ইউরো। ইউরোপের বলকান অঞ্চলে ও অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত একটি চমৎকার পর্যটনপ্রধান দেশ। সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের দেশটি ১৯৯১ সালের ২৫ জুন যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।