১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলের সেই রাত শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে। চেরনোবিল দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টর ধ্বংস হয়, বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে লাখো মানুষের জীবন বদলে যায়। জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির মূল্যায়নে, দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৩০ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে এবং ১০০–এর বেশি মানুষ বিকিরণজনিত আঘাত পান।

কিন্তু সেই রাতের গল্প শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউক্রেনে, প্রিপিয়াত শহরের কাছে। কেন্দ্রটিতে আরবিএমকে–১০০০ ধরনের রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হতো। ৪ নম্বর ইউনিটটি ১৯৮৩ সালে চালু হয়। ১৯৮৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সেখানে একটি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাইরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে টারবাইন ঘুরতে থাকা অবস্থায় তার জড়তা থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ কিছু সময়ের জন্য জরুরি পাম্প ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালাতে পারবে কি না, সেটি পরীক্ষা করা। পরীক্ষাটি নিজে অস্বাভাবিক কোনো বিষয় ছিল না। সমস্যা তৈরি হয় পরীক্ষাটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং রিঅ্যাক্টরের কিছু নকশাগত দুর্বলতার কারণে। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, দুর্ঘটনাটিকে শুধু অপারেটরদের ভুল বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। আইএইএর পরবর্তী আইএনএসএজি–৭ বিশ্লেষণে রিঅ্যাক্টরের নকশাগত ত্রুটি, বিশেষ করে উচ্চ পজিটিভ ভয়েড কোএফিশিয়েন্ট ও কন্ট্রোল রডের নকশার সমস্যা, দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে বাষ্পের পরিমাণ বাড়লে শক্তি কমার বদলে আরও বাড়তে পারত।

২৫ এপ্রিল রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ধীরে কমিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডের চাহিদার কারণে পরীক্ষাটি কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে যায়। ফলে অপারেটরদের একটি দল অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর পরীক্ষাটি চালানোর প্রস্তুতি নেয়। এ সময় রিঅ্যাক্টরের অবস্থা আগের পরিকল্পনার তুলনায় জটিল হয়ে ওঠে। রিঅ্যাক্টরের শক্তি কমিয়ে একটি নিম্ন পর্যায়ে আনা হলে সেটি প্রত্যাশার মতো স্থিতিশীল থাকেনি। রিঅ্যাক্টরের ভেতরে জেনন পয়জনিংয়ের মতো প্রক্রিয়াও শক্তি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। শক্তি ধরে রাখতে অপারেটররা অনেক কন্ট্রোল রড বের করে আনেন। এর ফলে রিঅ্যাক্টরের নিরাপদ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেটিং রিঅ্যাকটিভিটি মার্জিন বা ওআরএম খুব কমে যায়। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, এই সীমা ও এর গুরুত্ব অপারেটরদের কাছে যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না এবং সেই সময়কার নকশা ও নির্দেশনায়ও গুরুতর দুর্বলতা ছিল।

তারপর আসে সেই কয়েক সেকেন্ড, যা ইতিহাস বদলে দেয়। ২৬ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা ২৩ মিনিটের দিকে পরীক্ষা শুরু হয়। টারবাইনের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমতে থাকায় পানির প্রবাহ ও রিঅ্যাক্টরের ভেতরের পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। আরবিএমকে রিঅ্যাক্টরের একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য তখন সামনে আসে, বাষ্পের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে রিঅ্যাক্টরের রিঅ্যাকটিভিটি বাড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করে। অপারেটররা জরুরি শাটডাউন ব্যবস্থা চালু করেন। কিন্তু এখানেও রিঅ্যাক্টরের নকশাগত একটি গুরুতর দুর্বলতা বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। কন্ট্রোল রডের নকশায় এমন গ্রাফাইট ডিসপ্লেসার ছিল, যার কারণে রড প্রবেশের শুরুর মুহূর্তে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিঅ্যাকটিভিটি কমার বদলে সাময়িকভাবে বাড়তে পারত। আইএইএর পরবর্তী বিশ্লেষণ এই নকশাগত ত্রুটিকে দুর্ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

রিঅ্যাক্টরের শক্তি অত্যন্ত দ্রুত বেড়ে যায়। একটি বিশাল বাষ্প বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আরেকটি বিস্ফোরণ বা শক্তিশালী ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটে বলে তদন্তে বিবেচনা করা হয়। রিঅ্যাক্টরের ছাদ ও কাঠামো ভেঙে যায়। ৪ নম্বর ইউনিট কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। রিঅ্যাক্টরের ভেতরের জ্বলন্ত গ্রাফাইট ও অন্যান্য পদার্থ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আকাশে উঠে যেতে থাকে তেজস্ক্রিয় ধোঁয়া ও কণা। কিন্তু তখন সেখানে থাকা অনেক মানুষ জানতেনই না যে তাঁরা কতটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। আগুন নেভাতে প্রথম যে মানুষগুলো ছুটে যান, তাঁদের অনেকেই ছিলেন অগ্নিনির্বাপণকর্মী। তাঁদের কাজ ছিল আগুন নিয়ন্ত্রণ করা। তাঁরা পারমাণবিক দুর্ঘটনার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না এবং তখনো বিকিরণের মাত্রা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা ছিল না। তাঁদের কেউ রিঅ্যাক্টরের ধ্বংসস্তূপের খুব কাছে চলে যান। উচ্চ মাত্রার বিকিরণের কারণে অনেকের শরীরে দ্রুত রেডিয়েশন সিকনেসের লক্ষণ দেখা দেয়। চেরনোবিলের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তাঁদের কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগুন আরও ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।

জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় সাইটে থাকা প্রায় ৬০০ কর্মীর মধ্যে ১৩৪ জন উচ্চ মাত্রার বিকিরণে তীব্র রেডিয়েশন সিকনেসে আক্রান্ত হন। তাঁদের মধ্যে ২৮ জন প্রথম তিন মাসে মারা যান।