বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগান ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৮৫৭ সালে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়।’ সংগঠনটির ইতিহাসবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, এটিই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যিক চা–শিল্পের অন্যতম প্রাথমিক কেন্দ্র।
অন্যদিকে বাংলাপিডিয়ার ‘টি ইন্ডাস্ট্রি’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘চট্টগ্রামে ১৮৪০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ শুরু হলেও সিলেটের সুরমা উপত্যকাই পরে পূর্ববঙ্গের প্রধান চা উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হয়।’
চা-বাগান বাড়তে থাকলেও দেখা দেয় শ্রমিকের সংকট। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে দীর্ঘ সময়ের চা চাষের কাজে নিয়োগ করা কঠিন হওয়ায় ব্রিটিশ বাগানমালিকেরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করতে শুরু করেন। গবেষণাভিত্তিক ইতিহাসে ছোটনাগপুর, বিহার, ওডিশা, মধ্যপ্রদেশ ও বর্তমান অন্ধ্র প্রদেশ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শ্রমিক নিয়োগের কথা পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে মুন্ডা, সাঁওতাল, ওঁরাও, হো, গন্ডসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন।
‘টি গার্ডেন কমিউনিটির’ ইতিহাসবিষয়ক সংকলনে এই নিয়োগকে কঠোর চুক্তিনির্ভর শ্রমব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং শ্রমিক সংগ্রহে ‘আরকাট্টি’ বা নিয়োগকারী দালালদের প্রতারণা ও জবরদস্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ শতকের শুরুতে চা–শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ১৯২০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তার প্রভাব আসামের চা–বাগান অঞ্চলেও পৌঁছে যায়। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘১৯২১ সালের মে মাসের শুরুতে কংগ্রেসের উদ্যোগে কাছাড় অঞ্চলে সভা হয় এবং চা–শ্রমিকদের মধ্যে নিজেদের “মুল্লুক”-এ ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে।’
এই ‘মুল্লুক’ মানে হচ্ছে নিজেদের জন্মস্থান। প্রথম আলোর একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ‘১ ও ২ মে ১৯২১ কাছাড়ের রাতারবাড়ী বাজারে সভার পর আন্দোলন তীব্র হয়। ৩ মে আনিপুর চা-বাগানের প্রায় ৭৫০ শ্রমিক স্ত্রী-সন্তানসহ বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। পরে বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিক তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল পূর্বপুরুষের ভূমিতে ফিরে যাওয়া। এই প্রত্যাবর্তনের ডাকই শ্রমিকদের ভাষায় পরিচিত হয় “মুল্লুকে চলো” নামে।’ ইতিহাসবিদদের কাছে ঘটনাটি আবার ‘চরগোলা এক্সোডাস’ নামেও পরিচিত।