গোলাপি ফতুয়া, টকটকে লাল স্কার্ট, এক বেণিতে বাঁধা চুল, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আর কাঁধে পোষা টিয়া পাখি মিঠু– নব্বইয়ের দশকের শুরুতে পর্দায় ভেসে ওঠা এই অবয়বটি কেবল ৯ বছরের এক গ্রামীণ বালিকাকে ফুটিয়ে তোলেনি, হয়ে উঠেছিল দক্ষিণ এশিয়ার শিশু অধিকার ও প্রতিবাদের এক প্রতীক। তবে ২৮ বছরের পুরোনো এই পরিচিত চেহারাটি এখনও প্রাসঙ্গিক শিশু নিখোঁজ, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নতুন করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জোরালো বার্তার জায়গায়।
আজ মীনা দিবস। ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর মীনা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের ‘মেয়ে শিশুর দশক’-কে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় ইউনিসেফ এই অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র সিরিজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ‘ভারতীয় অ্যানিমেশনের জনক’ রাম মোহনের হাতে প্রাণ পায় মীনা, তার ভাই রাজু ও পোষা পাখি মিঠুর জগৎ। দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের নিজস্ব রূপ দিতে চার দেশের শিল্পীদের আঁকা স্কেচ এবং ১০ হাজারেরও বেশি শিশুর মতামত নিয়ে মীনার চেহারা, গোলাপি ফতুয়া-লাল স্কার্টের পোশাক ও চাল-চলন চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) ‘মুরগিগুলো গুনে রাখো’ পর্ব সম্প্রচারের মাধ্যমে মীনার আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার শুরু হয়। পরে ২৬টি টেলিভিশন পর্বের পাশাপাশি কমিক বই, রেডিও শো, ২০০৫ সালে প্রবর্তিত ‘মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’ এবং ২০১৬ সালে চালু হওয়া ‘মীনা গেম’ অ্যাপের মাধ্যমে এটি নতুন প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে। মূল পাঁচটি ভাষা (বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি ও উর্দু) ছাড়াও আঞ্চলিক ও নানা আন্তর্জাতিক ভাষায় মীনা প্রচারিত হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের শহরের প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং গ্রামের ৮১ শতাংশ শিশু-কিশোর মীনাকে চেনে।
নব্বইয়ের দশকের সামাজিক বাস্তবতা ছিল বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, স্কুলে যেতে না পারা আর প্লেটে ভাইয়ের চেয়ে কম খাবার পাওয়া। মীনা শিখিয়েছিল, কীভাবে রাজুর সমান ডিমের ভাগ বুঝে নিতে হয়, কীভাবে নিজের স্কুলে যাওয়ার অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠে– মীনার লড়াই কি কেবল সেই পুরোনো শিকড়েই আটকে আছে?
আজকের বাস্তবতা আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং জটিল বলে জানান তরুণ শিল্পী আশফাকুর রহমান। তিনি বলেন– ২০২৬ সালে এসে যখন আমরা মীনা দিবস পালন করছি, তখন কন্যাশিশুর সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি কেবল স্কুলে না যাওয়া বা খাবারের বৈষম্য নয়, তাদের নিরাপত্তার ওপর নেমে এসেছে শিশু নিখোঁজ, নির্মম শিশু নির্যাতন এবং প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা নারী নির্যাতনের বিভীষিকা। ঘরের বাইরে অচেনা হাত বাড়িয়ে ওত পেতে থাকা অপহরণকারী, পারিবারিক ও সামাজিক বলয়ে লুকিয়ে থাকা নির্যাতনকারী আর নতুন প্রযুক্তির যুগের নানা ঝুঁকি আজকের মেয়ে শিশুটির প্রতিটি পদক্ষেপকে করে তুলেছে শঙ্কিত। নব্বইয়ের দশকে যে মেয়েটি রাজুর সঙ্গে হেসেখেলে নিশ্চিন্তে স্কুলে যেত, ২০২৬ সালে সেই মেয়েটির নিরাপদে ঘরে ফেরাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নব্বই থেকে শুরু হয়ে আজ দ্বিতীয় প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া মীনা কেবল বিটিভির সেই রঙিন অ্যানিমেশন বা অ্যাপ গেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই বিশেষ একটি শিশুও যেন নিখোঁজ না হয়, একটি মেয়েশিশুও যেন ঘর কিংবা বাইরে নির্যাতনের শিকার না হয় এবং প্রতিটি কন্যাশিশু যেন ভয়হীন আকাশে নিঃশ্বাস নিতে পারে– সেই নিরাপদ সমাজ গড়ার মধ্য দিয়েই মীনা দিবসের আসল তাৎপর্য সার্থক হবে।