শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬Loginপদার্থবিজ্ঞানপ্রযুক্তিগণিতমহাকাশজীববিজ্ঞানকার্যকারণবিজ্ঞান কল্পগল্পকমিকসবিজ্ঞানরম্যসাক্ষাৎকার গণিতগণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রতিসাম্যের জাদু লেখা: হিমাংশু করআপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪: ০০ অসলো, মে ২০০৮। সে বছর নরওয়ের রাজা হ্যারল্ড গণিতবিদ জন থম্পসন ও জ্যাকুস টিটসকে গণিতের রাজ্যের সবচেয়ে সম্মানজনক স্বীকৃতি—অ্যাবেল পুরস্কার দেন। সে বছরের পুরস্কারের মধ্যে একধরনের মজার প্রতিসাম্য ছিল। যে প্রকল্পের জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়, সেটি শুরু করেছিলেন উনিশ শতকের নরওয়েজিয়ান গণিতবিদ নীলস অ্যাবেল। তাঁর নামানুসারেই এই অ্যাবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। আর সেই সাড়া জাগানো প্রকল্প শেষ করার জন্যই ২০০৮-এর এই পুরস্কারটি দেওয়া হয় গণিতবিদ দুজনকে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গণিতবিদেরা মূলত প্রতিসাম্যের সংজ্ঞা জানতে চেয়েছিলেন।

প্রতিসাম্য বিষয়টি আসলে কী? অনেকেই আয়নায় মানুষের মুখের ডান-বাম প্রতিসাম্যের কথা বলবেন। মানুষের মুখের চেয়ে তুষারকণার প্রতিসাম্য আরও বেশি। ভাবছেন, প্রতিসাম্য আবার বেশি-কম হয় নাকি? মানুষের মুখের বাঁ দিক আর ডান দিক একই রকম, ফলে আয়নায় দেখার সময় বাঁ দিক ডান হয়ে গেলেও দেখতে একই রকম লাগে। কিন্তু মানুষের মুখ যদি আমরা উল্টে দিই, তাহলে কিন্তু দেখতে আর আগের মতো লাগবে না। তবে একটি তুষারকণাকে উল্টে দিলেও সেটি দেখতে মনে হবে আগের মতোই। শুধু তাই নয়, প্রতিবার ৬০ ডিগ্রি ঘোরানোর পরও তুষারকণাটি দেখতে আগের মতোই লাগবে। অর্থাৎ মানুষের মুখের চেয়ে তুষারকণার প্রতিসাম্য আরও বেশি। তুষারকণা বা কোনো বস্তুর চেয়ে সাধারণ কোনো জ্যামিতিক আকৃতির মধ্যে আরও বেশি প্রতিসাম্য থাকা সম্ভব। একটি বৃত্তকে আমরা যে কোণেই ঘোরাই না কেন, দেখতে আগের মতো লাগবে। তাই বলা যায়, প্রতিসাম্য হলো এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যেখানে কোনো পরিবর্তন করা হলেও পরিবর্তনের পর কোনোভাবে সেটি আবার ফিরে আসে আগের অবস্থায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি আরও অনেক ধরনের প্রতিসাম্য থাকা সম্ভব?

গাণিতিক প্রতিসাম্য গণিতবিদদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা বস্তুর বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, তা ওই বস্তুর আকৃতির প্রতিসাম্য থেকে বলা যায়। একটি স্ফটিক কত রকম হতে পারে, তা জানার জন্য রসায়নবিদের মূল চাবিকাঠি হলো প্রতিসাম্য। এ থেকে রসায়নবিদেরা কোনো স্ফটিকের অজানা গঠন সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন। জীববিজ্ঞানীদের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ভাইরাসের কাজ করার পদ্ধতি কেমন হবে, তা ভাইরাসটির প্রতিসাম্য থেকে বোঝা সম্ভব। এমনকি বড় বড় পাটিকেল কলাইডারে পদার্থবিজ্ঞানীরা যেসব কণা আবিষ্কার করেছেন, প্রতিসাম্য না জানলে তাদের চরিত্র বোঝা কঠিন। এমনকি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে তথ্য সংরক্ষণের পেছনেও এর ভূমিকা আছে।

প্রতিসাম্যের ধারণা সেই প্রাচীন সভ্যতাগুলোকেও সম্মোহিত করে রেখেছিল। কিন্তু উনিশ শতক পর্যন্ত আমরা এর গাণিতিক রূপ বোঝার মতো ভাষা তৈরি করতে পারিনি। এই ভাষা আমাদের প্রতিসাম্যকে আলাদা করে শিখতে এবং এর গাঠনিক উপাদানগুলো আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছে।

পদার্থের অণুকে যেমন পরমাণুর মতো ছোট কণায় ভেঙে ফেলা যায়, আবার ৩, ৫, ৭-এর মতো কিছু অবিভাজ্য মৌলিক সংখ্যা দিয়ে যেমন যেকোনো সংখ্যা তৈরি করা যায়, তেমনি অ্যাবেলের সময়কার গণিতবিদেরা আবিষ্কার করেন, কোনো প্রতিসম বস্তুকেও কিছু অবিভাজ্য প্রতিসম আকৃতিতে ভেঙে ফেলা যায়। তাঁরা এর নাম দেন ‘সাধারণ গ্রুপ’। এগুলোকে তুলনামূলকভাবে বলা যায় ‘প্রতিসাম্যের পরমাণু’।

অ্যাবেলের সমসাময়িক গণিতবিদেরা আবিষ্কার করেন, কিছু সাধারণ গ্রুপের পেছনে কাজ করছে কিছু মৌলিক সংখ্যা। বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা একটি ১৫ বাহুবিশিষ্ট বহুভুজ নিই। এর ভেতরে থাকা একটি পঞ্চভুজ ও একটি ত্রিভুজের প্রতিসাম্য থেকেই আমরা এর প্রতিসাম্যতা তৈরি করতে পারব। এটি কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য চিন্তা করুন, আমরা এই বহুভুজটিকে পূর্ণ ঘূর্ণনের ১৫ ভাগের ১ ভাগ ঘোরাব। এতে বহুভুজটি ফিরে পাবে আগের আকৃতি। এই কাজটি এবার আমরা একটু ভিন্নভাবে করব। এর জন্য আমাদের প্রথমে বহুভুজটিকে পূর্ণ ঘূর্ণনের ৫ ভাগের ২ ভাগ ঘোরাতে হবে এবং তারপর এর উল্টো দিকে ৩ ভাগের ১ ভাগ ঘোরাতে হবে। দুবারই কিন্তু একই ফল পাওয়া যাবে, কারণ ১/১৫ = ২/৫ - ১/৩। এই বহুভুজটির ভেতর লুকিয়ে থাকা একটি ত্রিভুজ ও পঞ্চভুজের কারণেই এটা সম্ভব হচ্ছে।