শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি দূর পরবাসকৈশোরে আমি এবং সেলেখা: মিজানুর রহমান, সুইডেন থেকেপ্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১০: ২৩ অলকরণ: মাসুক হেলালএসএসসি পরীক্ষার পর অপূর্ব নিজ বাড়িতে অলস সময় পার করছিল। সংসারের একমাত্র ছেলে। মা–বাবার অনেক আদরের। ছোট দুই বোন আছে, বয়সের ব্যবধান ১০–১২ বছর। বাবা হাইস্কুলশিক্ষক, অল্প বেতনের চাকরি, মা পরিবারের প্রধান; কারণ, সীমিত আয়ের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার মা-ই করতে পারেন। বাবা রশিদ সাহেব ছোট চাকরি করলেও সংসারে ততটা অভাব অভিযোগ নেই। রশিদ সাহেবের বাপ–দাদা প্রায় জমিদারের কাছাকাছি ছিলেন, জমিজমা ভালোই ছিল। বিভিন্ন উপলক্ষে জমি বিক্রির প্রয়োজন পড়ে, তারপরও যা আছে, তা দিয়ে সংসার ভালোই চলে যাচ্ছে।

রশিদ সাহেব চাকরি থেকে ঘরে ফিরে আসেন, কিন্তু অতটা বিশ্রামের প্রয়োজন বোধ করেন না। সামান্য নাশতা–পানি খেয়ে গেঞ্জি গায়ে বেরিয়ে পড়েন সবজিখেত পরিচর্যা করতে। কী নেই তাদের বাড়ির উর্বর জমিতে, কাঁচা মরিচ, শিম, টমেটো কোনো কিছুই কিনতে হয় না। বাড়িটিও অনেক বড়, বিশাল আকারের দুটি বড় পুকুর, মাছের পরিপূর্ণ জোগান আসে বাড়ির পুকুর থেকেই। মোটাদাগে শাকসবজি, তরিতরকারি পুরোটাই আবাদ হয়, ফলফলাদিরও কোনো অভাব হয় না। এত সব কাজ করে ও রশিদ সাহেব ক্লান্ত হন না, শরীর মাশা আল্লাহ ভালোই থাকে।

অপূর্ব দু–তিন মাস পর যখনই ঢাকা থেকে বাড়ি আসে, অবাক হয় বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে। বাবার মতো সে একদমই হয়নি, সে কিছুটা অলস প্রকৃতির, তবে মায়ের অনেক গুণ তার মধ্যে আছে। সে অতিশয় ভদ্র, ধৈর্যশীল।

একদিন সবজিখেতের আইলে বসে অপূর্ব দেখছিল কীভাবে তার বাবা এবং পাশের বাড়ির দেবাশীষ দাদা আগাছা পরিষ্কার করছিলেন। বলে রাখা ভালো, এই দেবাশীষ দাদা হচ্ছেন রশিদ সাহেবের ডান হাত। সব প্রয়োজনে দেবাশীষ দাদার ডাক পড়ে। মনেপ্রাণে একজন মাটির মানুষ দেবাশীষ দাদা, ভিন্ন ধর্মের হলেও এই পরিবারের সাথে তাঁর আত্মার সম্পর্ক। ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই দেবাশীষ দাদার। মূলত রশিদ সাহেবদের খেতখামার বর্গা করে দেবাশীষ দাদার আয়রোজগার যা হয়, তাতেই উনার সংসার চলে। তামাটে রঙের পোড়ানো শরীর দেখলেই বাংলাদেশের আপামর কৃষকের কথা মনে পড়ে যায়। শক্ত শরীর, অত্যন্ত পরিশ্রমী এই মানুষেরাই দেশের উৎপাদিত বেশির ভাগ খাবারের জোগানদাতা। দেবাশীষ দাদাকে জামাকাপড় পরা অবস্থায় খুব কমই দেখা যায়। একখানা লুঙ্গি সাথে খালি শরীর নিত্যদিনের চিত্র। সারা দিন রোদে পুড়ে বেলা শেষে বাড়ি ফেরা। রাতে কখনো কখনো টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানিতে শরীর ভিজে যায়। দরিদ্র কৃষকের অসহায় বাস্তবতা।

দেবাশীষ দাদা কাজের পাশাপাশি অপূর্বর সাথে টুকটাক কথা বলছিলেন। হঠাৎ করে একটি মেয়ে দৌড়ে আসছিল, অপূর্ব যেখানে বসে ছিল, ঠিক তার পাশ দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। পিছে আরও একজন দৌড়ে আসছিল, এবার অপূর্ব বুঝতে পারল যে আগে দৌড়ে গেল, সে এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। পেছনে যাওয়া মেয়েটি ছিল অপূর্বর চাচাতো বোন। এবার অনুমান করা গেছে মেয়েটি কে ছিল? ছোটবেলায় দু–একবার হয়তো দেখেছে তাকে কিন্তু চেহারা অতটা মনে ছিল না। মেয়েটির নাম জানা ছিল, পরিচয় অতটা ছিল না। শাহনাজ এত বড় হয়ে গেছে, ভাবতেই অবাক লাগছে। শাহনাজ যেভাবে দৌড়ে গেল এবং সে উচ্চ স্বরে হাসছিল। তার এলোমেলো দৌড় আর হাসি অপূর্বর মনে এমন এক ধাক্কা দিল, যেন বারবার একই দৃশ্য চোখে ভাসতে লাগল। অদ্ভূত এক অনুভূতি, মনের মাঝেও কেমন একটা দাগ কেটে গেল। সন্ধ্যা নামল, সবাই ঘরে ফিরল; কিন্তু বিকেলের সেই দৃশ্য, শাহনাজকে দেখে যে ঝড় শুরু হয়েছে, অপূর্বর মনে তা থামছে না।

মনে হচ্ছে হঠাৎ সবকিছু অস্থির হয়ে গেছে, প্রাণের স্পন্দন বেড়ে গেছে। আশপাশের সবকিছুই ভালো লাগছে, অনেক ভেবেচিন্তে অপূর্ব বুঝতে পারল সে শাহনাজের প্রেমে পড়েছে। প্রথম প্রেম বোধ হয় এভাবেই জেগে ওঠে, আগেপিছে কোনো ভাবনাচিন্তা নেই। মেয়েটি এখনো কিছুই জানে না আর ছেলেটি মনে মনে বহুদূর যেতে থাকল। কল্পনায় বাধা দেওয়ার কেউ নেই, যত দূর ইচ্ছা মনের বাসনা পূরণ করা সম্ভব।