শরৎ এলে খালের দুধারে কাশফুল ফুটে ভরে যেত। জেলেপাড়ার ছোট ছেলেদের দেখতাম সেখান থেকে কাশফুল নিয়ে এসে আমাদের বাসার একেবারে সামনে জেলেপাড়ার মন্দিরের গেটে লাগিয়ে রেখেছে। এই মন্দিরের ভেতরেই পূজার দু–আড়াই মাস আগে থেকে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি শুরু হয়ে যেত। সেই প্রতিমার কাঠামোর পেছনে কেউ এসে লাগিয়ে দিত কাশফুল। প্রতিমা তৈরির শুরুর দিন থেকেই আমাদের মনের মধ্যে পূজা পূজা আনন্দের ভাব জেগে উঠত। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় বাসার গেট থেকে বেরিয়েই প্রথমে উঁকি মারতাম মন্দিরে। স্কুল থেকে ফিরে এসেও বিকেলে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে শিল্পীদের একটু একটু করে গড়ে তোলা শিল্পকর্ম দেখে মুগ্ধ হতাম। কখনো কখনো খড়ের ব্যানারের ওপর মাটির প্রলেপ চাপানো কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী কিংবা সরস্বতী—কাউকে কাউকে রোদে শুকাতে দেওয়ার জন্য আমাদের বাসার গেটের ভেতরে এনে রাখা হতো। দেখে এত আনন্দ হতো তখন।
পূজার দশ–বারো দিন আগে থেকেই জেলেপাড়ায় ঢাক বেজে উঠত। ঢাকের সঙ্গে বাঁধা থাকত কাশফুল। জেলেপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে গিয়ে একদিন আমিও খালপাড় থেকে অনেকগুলো কাশফুল তুলে নিয়ে এলাম। বড় রাস্তা থেকে ব্রিজের এক পাশ দিয়ে নিচে খালে নেমে কাদামাটি ডিঙিয়ে কাশফুলের জঙ্গলে গিয়ে উঠতে হতো। আমার একার তাই কখনো সাহস হয়নি ওখানে যাওয়ার।
চৈত্র মাসের শেষের দিকে আমার চাটগাঁইয়া মা বেলকুমারীর ব্রত পালন করতেন। সারা দিন কিছু খেতেন না, সন্ধ্যা হওয়ার মুখে শেষবিকেলে ভাত খেয়ে নিতেন। এই ব্রতকে তাই বেলাভাতও বলা হয়। এভাবে প্রায় দুই সপ্তাহ ব্রত পালন করার পর একদিন শোল মাছের তরকারি, ডিমের তরকারি, ভাতের সঙ্গে আমিষ-নিরামিষ নানা পদ রান্না করে নানা রকম ফলসহ কলাপাতায় সাজিয়ে দুপুরে বেলকুমারীর পূজা করা হতো। পূজা শেষে কলাপাতায় সাজানো সেই ভোগ একটা কুলায় নিয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশে আমি গিয়ে রেখে আসতাম সেই খালপাড়ে। হাতে একটা নতুন বেতের পাখাও থাকত। পাখাটি নদীতে ডুবিয়ে আনতাম আর বাসায় এসে পাখার বাতাস খেত সবাই। এভাবে প্রতিবছর একবার করে সেই খালে নামতাম। সঙ্গে মোমবাতি আর ধূপকাঠি নিয়ে ওপরে দাঁড়িয়ে থাকত ভাই।
খালের পাড়ে ভোগ সাজিয়ে পাশেই মোমবাতি ও ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দিতাম। একবার নিচে নেমে দেখি, নৌকায় এক মাঝি বসে আছেন। আমাকে দেখেই বললেন, ‘খোকা, আমাকে খেতে দাও।’ আমি আনন্দের সঙ্গে দুপুরবেলার সেই ভোগ মাঝির হাতে তুলে দিলাম। নৌকার সামনে মোমবাতি ও ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দিলাম। মাঝির মুখে হাসি। আর ওপরে উঠে দেখতে লাগলাম, কত তৃপ্তিভরে আনন্দের সঙ্গে তিনি খাচ্ছেন। মাকে এসে বলতেই বললেন, ‘আমার ব্রত সফল হয়েছে। ঈশ্বর আসলে মাঝির রূপ ধরে এসে সেই ভোগ খেয়ে গিয়েছেন।’
খালপাড় থেকে কাশফুল নিয়ে এসে টিভির কাঠের বাক্সের ওপরে অ্যানটেনার মতো সাজিয়ে রাখতাম। বাসার পাখার বাতাসে পেঁজা তুলোর মতো গোটা ঘরে কাশফুল উড়ে বেড়াত। মনের মধ্যে হু হু করে ঢুকে পড়ত শারদীয় উৎসবের বাতাস। এখন শুধু স্কুল কবে ছুটি হবে তার অপেক্ষা।
আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে পূজার কেনাকাটা হতো খুব হিসাব করে। একবার হয়তো ছোট মামা আমাদের তিন ভাইবোনকে পূজার নতুন জামাকাপড় কিনে দিলেন। বাবা সেই বছর আর কিছু কিনে দিলেন না। মা–বাবাকেও পূজার জন্য আলাদা করে কখনো কিছু কিনতে দেখিনি। বাবা হয়তো আমাদের জন্য নতুন গেঞ্জি কেনার সময় নিজের জন্যও দুটো কিনে নিয়েছেন। মায়ের ঘরে পরার জন্য শাড়ি প্রয়োজন অনুযায়ী বাবা বছরের যেকোনো সময় কিনে আনতেন। বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য দামি নতুন শাড়ি দুই বছরে একটা হয়তো আসত। কারণ, আগের অনেক শাড়ি আলমারি ভর্তি হয়ে আছে। আমাদের মায়েদের বছরে দু–একবার শহরে বা শহর ছেড়ে বাপের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, বোনের বাড়ি যাওয়া, বিয়েবাড়ি বা আত্মীয়দের নানা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার ছিল না। ফলে স্নো, পাউডার, নারকেল তেল ছাড়া নতুন কোনো প্রসাধনীও কখনো কেনা হতো না। চট্টগ্রামের বিখ্যাত গোল্লা সাবান ঘষতে ঘষতেই সব পুরোনো কাপড় বছরের পর বছর নতুন হয়ে যেত। একটা শাড়ি বা লুঙ্গি ছেঁড়ার মতো অবস্থায় না এলে কেউ নতুন কাপড় কেনার কথা ভাবতই না।