সম্প্রতি একটি বই প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা এক লেখকের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাঁর সাহিত্যিক এজেন্ট বইটির প্রস্তাব বিভিন্ন প্রকাশকের কাছে পাঠিয়েছেন। প্রকাশকেরা বইটি গ্রহণ করবেন কি না, সেটিই এখন অপেক্ষার বিষয়। কিন্তু এই অপেক্ষা কেবল বই প্রকাশের অনিশ্চয়তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিজের পরিশ্রমের সার্থকতা এবং মানুষ হিসেবে নিজের মূল্য নিয়ে সংশয়।
লেখক মনে করছেন, বইটি প্রকাশের চুক্তি হলে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমবে। বইটি লেখার পেছনে ব্যয় করা সময়কে সার্থক মনে হবে। অন্য কোনো কাজে সময় ব্যয় করা উচিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও হয়তো আর তাড়া করবে না। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের অর্জন নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া যাবে।
এমন অনুভূতি অনেকের জীবনেই দেখা যায়। কেউ মনে করেন, কাঙ্ক্ষিত চাকরিটি পেলে জীবন গুছিয়ে যাবে। কেউ ভাবেন, নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় করতে পারলেই নিরাপত্তা ও তৃপ্তি আসবে। আবার কেউ সামাজিক স্বীকৃতি বা অন্যের প্রশংসার মধ্য দিয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ খোঁজেন। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের পরও প্রত্যাশা শেষ হয় না; বরং নতুন কোনো লক্ষ্য সামনে এসে দাঁড়ায়।
আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছোটা কেন শেষ হয় না‘ফিফটি ওয়ার্ডস ফর স্নো’ নামের একটি পডকাস্টে ফরাসি মনোবিশ্লেষক জাক লাকাঁর একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ধারণাটির নাম ‘অবজে পতি আ’। সহজভাবে বললে, এই ধারণা এমন একটি আকাঙ্ক্ষার উৎসকে বোঝায়, যা মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর বা অর্জনের পেছনে ছুটতে প্ররোচিত করে। মানুষ মনে করে, কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি হাতে পেলেই সুখ, পরিপূর্ণতা ও মানসিক শান্তি আসবে। অথচ সেই জিনিসের পক্ষে বাস্তবে মানুষের সব প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব নয়।
লেখকের কাছে বই প্রকাশের চুক্তিটি এমন একটি আকাঙ্ক্ষার বস্তু হয়ে উঠেছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বইটি প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু তার কাছে প্রত্যাশা আরও বড়—জীবনের অপূর্ণতা থেকে মুক্তি, নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের অবসান এবং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার চূড়ান্ত স্বীকৃতি।
এখানেই মূল সমস্যাটি। একটি নির্দিষ্ট অর্জনের সঙ্গে জীবনের সামগ্রিক সুখ ও আত্মমর্যাদাকে জুড়ে দিলে সেই অর্জনের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে হতাশা বাড়ে, আর ফল পাওয়া গেলেও সন্তুষ্টি দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারে।