টেলুরাইড এমন এক জায়গা, যা সারা বছরই পর্যটকদের চুম্বকের মতো টানে। আর সেখানে হোটেলভাড়া যেন আকাশ ছুঁতে চায়। বিশেষ করে ফল সিজনে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত, যখন এখানকার পাহাড়ি উপত্যকা অ্যাসপেন পাতার সোনালি আভায় মোড়ানো থাকে, তখন সেখানে পা ফেলার তিলমাত্র জায়গা থাকে না। ভাগ্যবশত রাতের মধ্যেই সবকিছু গুছিয়ে, ঘোরার ছক কেটে এবং থাকার একটা বন্দোবস্ত করে পরদিন আগস্টের ৫ তারিখ সকাল ঠিক ৭টায়, গাড়ির চাকা ঘুরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা দুজন।

বোন্ডারকে পেছনে ফেলে গাড়ি ছুটে চলল। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ ড্রাইভ শেষে আমরা পৌঁছালাম গানিসনে। সকালের নাশতা সেরে গাড়ির ট্যাংকটাও পূর্ণ করে নিলাম। এরপর শুরু হলো আসল রোমাঞ্চ। গানিসন ছাড়িয়ে যতই এগোতে লাগলাম, পথ যেন রূপকথার ক্যানভাস হয়ে উঠতে লাগল। ইউএস হাইওয়ে ৫০ ধরে এগিয়ে চলার সময় চোখে পড়ল গানিসন ন্যাশনাল ফরেস্টের আদিম সবুজ আর দিগন্তে দাঁড়িয়ে থাকা ব্লু মেসা রিজার্ভারের শান্ত জলরাশি। কাছেই কলোরাডোর বুক চিরে গড়ে ওঠা ‘ব্ল্যাক ক্যানিয়ন অব দ্য গানিসন’-এর খাড়া, পাথুরে দেয়াল দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিল না। ঐতিহাসিক এই অঞ্চলের প্রতিটি পাহাড়ি বাঁকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিল। কতবার যে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে বাধ্য হয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই।

আমাদের পথ এগিয়ে চলল উরের দিকে। এই আগস্টের সময়টায় অ্যাসপেন ও তার আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলে ওয়াইল্ডফায়ার চলছিল, তাই দূর থেকেই আকাশে ছাই আর ধোঁয়ার অদ্ভুত এক চাদর চোখে পড়ছিল। বাতাসটা কিছুটা ভারী মনে হচ্ছিল। কিন্তু আনকম্পাগ্রে ন্যাশনাল ফরেস্টের সীমানায় পৌঁছাতেই যেন জাদুবলে ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে আকাশ স্বচ্ছ হয়ে উঠল। সেই নীল আকাশের নিচে পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা খরস্রোতা আনকম্পাগ্রে নদী রূপালি ফিতার মতো আমাদের পাশে পাশে চলতে লাগল, যেন দূর থেকে হাতছানি দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছিল।

অবশেষে পৌঁছালাম উরেতে। চারপাশ থেকে আকাশছোঁয়া খাড়া পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই ছোট্ট শহরটিকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়েরা পরম আদরে তাকে কোলে আগলে রেখেছে। এখানকার ন্যাচারাল হট স্প্রিংসে আমরা একটু লম্বা বিরতি নিলাম। খনিজের উষ্ণ ছোঁয়ায় দীর্ঘ ড্রাইভের ক্লান্তি নিমেষেই উবে গেল। সেখানে ফ্রেশ হয়ে হালকা খাবার খেয়ে আবার স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখলাম। এবার শুরু হলো কলোরাডোর অন্যতম রোমাঞ্চকর পথ, ঐতিহাসিক ‘মিলিয়ন ডলার হাইওয়ে’ (ইউ.এস. রুট ৫৫০)। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাইভিংপ্রেমীদের কাছে এই পথ এক অপার স্বর্গ। এক পাশে খাড়া পাথুরে পাহাড়, অন্য পাশে কোনো গার্ডরেল ছাড়া গভীর খাদ, আর সামনে দিগন্তবিস্তৃত সান জুয়ান পর্বতমালা। স্থানীয় বাসিন্দারা ভালোবেসে একে ‘আমেরিকার সুইজারল্যান্ড’ বলে ডাকেন। সেখানে দাঁড়িয়ে যখন শীতল বাতাস গায়ে মাখছিলাম, মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোনো এক শান্ত, অচেনা চূড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি। কিছু দূর গিয়েই রাস্তার ঠিক পাশেই চোখে পড়ল প্রায় দুই শ ফুট উঁচু থেকে গর্জন করে নেমে আসা ‘বিয়ার ক্রিক ফলস’। সেই জলপ্রপাতের কাছে গাড়ি থামিয়ে পাহাড়ি জলকণার ঠান্ডা স্পর্শ নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম।

দিন শেষে আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল ডুরাঙ্গো। সান জুয়ানের এই অঞ্চলে টেলুরাইড বা সিলভারটনের চড়া খরচের মধ্যে তুলনামূলকভাবে একমাত্র এখানেই একটি সাধ্যের মধ্যে সুন্দর হোটেল পাওয়া গিয়েছিল। বিকেলের আলো মিলিয়ে যখন ডুরাঙ্গোয় পৌঁছালাম, শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। দ্রুত হোটেলে চেক-ইন করে একটু বিশ্রাম নিলাম। রাতের বেলা শহরের এক পরিচিত দেশীয় স্বাদের ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেলাম মনের মতো গরম খাবার। দীর্ঘ পাহাড়ি ড্রাইভের শারীরিক ক্লান্তি চোখে রাজ্যের ঘুম নামিয়ে আনছিল, কিন্তু মনে ছিল চাপা উত্তেজনা। কারণ, কাল সকালেই শুরু হবে স্বপ্নের টেলুরাইডের পথে আসল অভিযান।

পরদিন খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল। দ্রুত প্রস্তুত হয়ে হোটেলের চেকআউট সম্পন্ন করলাম। সকালের নাশতা সারতে ঢুঁ মারলাম ম্যাকডোনাল্ডসে। ঝটপট নাশতা শেষ করে ঠিক সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম টেলুরাইডের উদ্দেশ্যে। ডুরাঙ্গো থেকে টেলুরাইডের এই পথ যেন এক অন্য পৃথিবী। আমরা ড্রাইভ করে যাচ্ছিলাম বিশাল সান জুয়ান ন্যাশনাল ফরেস্ট ও লিজার্ড হেড পাসের ভেতর দিয়ে। চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়গুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। ঘন পাইন আর দেবদারুর বনে ঘেরা এই পাহাড়ি পথ দিয়ে যেতে যেতে মনে মনে ভাবছিলাম, আর মাত্র কয়েকটা সপ্তাহ পরই যখন ফল কালার শুরু হবে, তখন অ্যাসপেনের সোনালি রূপ এই পুরো জঙ্গলকে কেমন মোহনীয় চিত্রে রূপান্তর করবে! সেই কল্পনাই মনটাকে এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরিয়ে দিচ্ছিল।