শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি পাঠকওরহান গাজী: ওসমানীয় সাম্রাজ্যের মহাদিগন্ত সূচনায় ঐতিহাসিক নাম—তৃতীয় পর্বলেখা: তাওহীদ জানান অভিক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২: ৫৬ দ্বিতীয় পর্বের শেষে উল্লিখিত হয়েছে যে ওরহান বে তাঁর শাসনকালের প্রথমেই একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁর বাবা ওসমান গাজীর আমলের শেষের দিকে ওসমানীয় রাষ্ট্রে ১০ থেকে ১২ হাজার সৈন্য ছিল এবং ওরহান সিংহাসনে বসার পর থেকে সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করেন। তা ছাড়া আলাউদ্দিন পাশার পরামর্শে ওরহানই প্রথম জেনিচারি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেন। জেনিচারি বাহিনী মূলত ছিল সেই বাহিনী, যারা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানীতে প্রাসাদের পাশেই বসবাস করত এবং রাজধানী সুরক্ষায় দক্ষতার সঙ্গে শত্রুর আক্রমণ মোকাবিলা করত। এ জন্য তাদের ছোট থেকে নিয়মতান্ত্রিকতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচর্যা করে, বেশ কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে দক্ষ সৈন্য হিসেবে গড়ে তোলা হতো। আর জেনিচারি বাহিনী গঠনের জন্য বাছাই করা হতো বলকান অঞ্চলগুলোয় দাস হিসেবে বিক্রি করা খ্রিষ্টান ছেলেশিশুদের। যদিও কিছু কিছু সূত্রে, অনাথ খ্রিষ্টান ছেলেশিশুদেরও বাছাই করার কথা উঠে এসেছে। বাছাইপ্রক্রিয়ার পর, এ শিশুদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও ধীরে ধীরে ছোট থেকে শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করে একজন দক্ষ সৈন্য হিসেবে গড়ে তোলা হতো। পরবর্তী সময়ে একজন সৈন্য নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে জেনিচারি বাহিনীর সর্বনিম্ন পদ থেকে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক উচ্চ পদে যেতে পারতেন। এমনকি পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধিকাংশ উজিরই এসেছিলেন জেনিচারি বাহিনী থেকে। এটাই ছিল জেনিচারি বাহিনীর বিশেষত্ব। মূলত তারা ছিল ওসমানীয় সাম্রাজ্যের এক রাজকীয় বাহিনী। প্রথম দিকে জেনিচারি সৈন্যের সংখ্যা বেশি না হলেও আলাউদ্দিন পাশার এমন উদ্যোগে পরবর্তী সুলতানদের আমলে হাজার হাজার সৈন্যের জেনিচারি বাহিনী ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে ব্যাপকভাবে উপকার করেছিল।

ওরহান গাজী ১৩২৮ সালে রোমান সাম্রাজ্যের একসময়ের রাজধানী নিকিয়া শহর (বর্তমানে ইজনিক) অবরোধের উদ্যোগ নেন। তিনি প্রায় ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে নিকিয়া অবরোধ করেন। অবরোধ চলার সময়ে নিকিয়ার আশেপাশে রোমান বাহিনীর সঙ্গে কয়েকটি ছোট সংঘাতও হয় ওসমানীয় সৈন্যদের। তবে ওসমানীয়দের কাছে পরাস্ত হয়ে রোমান বাহিনী পিছু হটে যায়। নিকিয়া অবরোধ করে এক বছরের মধ্যেই রোমান সাম্রাজ্য থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। তৎকালীন রোমান সম্রাট, তৃতীয় আন্দ্রেনিকোস এ খবর পেয়ে বেশ রাগান্বিত হন এবং ওরহানের অবরোধ ভাঙতে ৪ হাজার দক্ষ রোমান সৈন্য নিয়ে কনস্টান্টিনোপোল থেকে নিকিয়ার পথে অগ্রসর হতে থাকেন।

রোমান সম্রাটের সেনাপতি হিসেবে ছিলেন কান্তাকুজেনাস। নিকিয়ার অবরোধ ভাঙতে আসা এই রোমান সৈন্যবাহিনী ছিল বেশ দক্ষ এবং শক্ত বর্ম পরিহিত। ১৩২৯ সালের ১০ জুন, বিথিনিয়ার কাছেই রোমান সম্রাট তার ৪ হাজার সৈন্য নিয়ে ওরহানের ৮ হাজার সৈন্যের মুখোমুখি হন। এ যুদ্ধকে ইতিহাসে ‘পেলেকাননের যুদ্ধ’ বলা হয়। শক্ত বর্ম পরিহিত রোমান বাহিনীর সামনে হালকা বর্ম পরিহিত ওসমানীয় বাহিনী সংখ্যায় বেশি হলেও, ওরহানের জন্য এই যুদ্ধ বেশ রক্তক্ষয়ী হয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিকে ওরহান ৩০০ জন অশ্বারোহী তিরন্দাজ পাঠিয়েছিলেন পাহাড়ের পাদদেশ থেকে আক্রমণ করতে, যাতে রোমান বাহিনীকে যেন পাহাড়ের দিকে অগ্রসর করিয়ে ফাঁদে ফেলা সম্ভব হয়। তবে ওরহানের এই কৌশল সফল হয়নি। তীরন্দাজদের আক্রমণ সামাল দিলেও রোমান বাহিনী পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হয়নি। ফলস্বরূপ ওসমানীয় বাহিনীর সঙ্গে বেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে রোমান বাহিনী। প্রথমে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ওসমানীয় বাহিনী যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে রোমান বাহিনী রাত হওয়ার আগেই পিছু হটা শুরু করে। তবে ওরহানের নির্দেশে কোনো সুযোগ না দিয়ে রোমানদের ওপর ওসমানীয় বাহিনী রাতেও হামলা চালাতে থাকে। একপর্যায়ে রোমান সম্রাট ও তার সেনাপতি দুজনই হামলার শিকার হয়ে আহত হয়। পরবর্তী সময়ে রাতের মধ্যেই পালাতে থাকে রোমান বাহিনী। এ সময় ওসমানীয় সৈন্যদের হামলায় অধিকাংশ রোমান সৈন্যের মৃত্যু ঘটে। পরদিন সকাল হতেই যুদ্ধের ময়দানে জীবিত কোনো রোমান সৈন্যকে আর দেখা যায়নি। কিছু সূত্র অনুযায়ী, রোমান সম্রাট আগের রাতেই গুটি কয়েক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যান। আর বেঁচে থাকা অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে ভোর হওয়ার আগেই সেনাপতি কান্তাকুজেনাস সমুদ্রপথে কনস্টান্টিনোপলে চলে যান। ফলে পেলেকানন প্রান্তরের রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে রোমানদের বিরুদ্ধে বিজয় হয় ওরহানের নেতৃত্বে থাকা ওসমানীয় সৈন্যবাহিনীর৷

এই যুদ্ধ ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছিল, কারণ স্বয়ং একজন রোমান সম্রাট নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে এসে পরাজিত হয়েছিল ওসমানীয় সুলতানের কাছে। অন্যদিকে এ যুদ্ধে পরাজয় হওয়া ছিল রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে কলঙ্কিত এক অধ্যায়। এ ছাড়া পেলেকাননের বিজয়কে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বড় জয়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বড় বিজয় বলা হয়।

এই যুদ্ধে বিজয় হওয়ার পর ওরহান নিকিয়া শহরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে তীব্র অবরোধের নির্দেশ দেন। তবে নিকিয়া লেকের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছিল ওসমানীয় বাহিনীকে। এ জন্য অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে থাকে। তা ছাড়া অবরোধমুক্ত করতে আসা রোমান বাহিনীর পরাজয়ে নিকিয়ার তৎকালীন গভর্নরও হতাশ হয়ে পড়েন। দুই বছর পর ১৩৩১ সালে দীর্ঘদিনের অবরোধে নিকার জনগণ ও সৈন্যরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। দুর্ভিক্ষ আসন্ন দেখে সেখানের রোমান গভর্নরও শহর রক্ষা করার আশা ছেড়ে দেন। তা ছাড়া রোমান সম্রাট নিকিয়া রক্ষায় নতুন কোনো বাহিনী বা সহায়তাও দিচ্ছিলেন না। ফলে ১৩৩১ সালের ২ মার্চ, নিকিয়া শহর ওরহানের নিকট সমর্পণ করা হয়। ওরহান তাঁর সৈন্যদের নিয়ে কোনো রকম প্রতিরোধের মুখে না পড়েই নিকিয়া শহরে ঢুকে পড়েন। এ সময় রোমান গভর্নর ও তাঁর ২ হাজার রোমান সৈন্য আত্মসমর্পণ করলে, তাঁদের ওরহান নিকিয়া থেকে নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। চলবে...