একটি ছবি তুলতে লাগে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ। কিন্তু সেই মুহূর্তটিতে পৌঁছাতে লাগে দিনের পর দিন হাঁটা, ঠান্ডায় কাঁপা, অচেনা মানুষের ঘরে ঠাঁই নেওয়া। ফ্রেমে ধরা পড়ে শুধু ফলটুকু। পথের গল্প থেকে যায় ক্যামেরার পেছনে। হিমালয় থেকে বান্দরবান, ওরেগনের আগ্নেয় পর্বত থেকে এভারেস্টের সন্ধ্যা। পাঁচ আলোকচিত্রী শোনালেন তাদের পাঁচটি ছবির পেছনের কথা। গ্রন্থনা ফরহান জামান

ঘুম ভাঙতেই বেরিয়ে পড়লাম লবুচের আশপাশ দেখতে। ছোট্ট গ্রাম। শুরুতে একটা বড় টি হাউস, সামনে আরও তিন-চারটা পাশাপাশি। এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেকের পথে সবচেয়ে ছোট আর দুর্গম গ্রামগুলোর একটি। টি হাউসের পেছনে দু-তিনটি শেরপা বাড়ি, কয়েকটা ঘোড়া। আছে স্থানীয়দের একটা খাবার ঘর, সেখানে আড্ডা জমে। ওদের জীবনটা কাছ থেকে দেখতে আমিও বসে পড়লাম। আড্ডায় আড্ডায় দুপুর গড়াল। টি হাউসে ফিরে ব্যাকপ্যাক আর ক্যামেরা গুছিয়ে নিলাম। আজকের পরিকল্পনা কালাপাথর আর সেখান থেকে এভারেস্টের সূর্যাস্ত। বেসক্যাম্প থেকে এভারেস্টের চূড়া ভালো দেখা যায় না। এত খোলামেলা করে দেখার জায়গা এ পথে কালাপাথরই। একটু একটু করে উঠি, দূরে এভারেস্টও একটু একটু করে উঁকি দেয়। বিকেল গড়ায়, আমি বারবার থামি আর বড় হতে থাকা চূড়ার ছবি তুলি। কী ঝকঝকে দিন! আকাশে এক ফোঁটা মেঘ নেই। সন্ধ্যা নামছে। চূড়ায় পৌঁছাতে তখনও শখানেক মিটার বাকি। ওদিকে এভারেস্টে লাল আভা। দোটানায় পড়লাম। ওপরে উঠব, নাকি এখানেই ট্রাইপড বসাব? শেষে নিজেকে বোঝালাম, কালাপাথরে আবার আসা যাবে। কিন্তু মেঘহীন আকাশ আর আগুনরাঙা চূড়া সবসময় কপালে জোটে না। নিচের ঢালে কোথাও সমতল জায়গা নেই। বরফ আর পাথর সরিয়ে কোনোমতে ট্রাইপড দাঁড় করালাম। একে একে ছবি আর টাইমল্যাপস নিলাম। আলো ধীরে ধীরে ওপরে উঠে যাচ্ছে। একসময় শুধু এভারেস্টের মাথাটুকু জ্বলতে থাকল। হঠাৎ খেয়াল হলো, সবাই নেমে গেছে। ট্রাইপড খুলতে গিয়ে পড়লাম মহাবিপদে। ঢালে ব্যাগ রাখার মতো এক চিলতে জায়গাও নেই। চারপাশে আমি ছাড়া কেউ নেই। মিনিট গড়ায়, দিগন্তে আলো মিলিয়ে যায়, হাড়ে ঢোকে কাঁপুনি ধরানো ঠান্ডা। ব্যাগ কোথায় রাখব, কখন গোছাব, নামবই বা কীভাবে? আদৌ কি নামতে পারব?

ই-মেইল: [email protected], [email protected]