দুদিনের তুষারপাতে হাঁটু সমান নরম বরফে ঢেকে গেছে পথ। আবহাওয়া খারাপ দেখে এজেন্সি আগেই অভিযান বাতিল করে দিয়েছিল। তবু গত শুক্রবার মধ্যরাতে পা বাড়ালেন ইকরামুল হাসান শাকিল। শনিবার রাশিয়ার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টায়, বাংলাদেশ সময় সাড়ে ১০টায় তিনি পৌঁছেন ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুসের চূড়ায়।
ককেশাস পর্বতমালার ৫ হাজার ৬৪২ মিটার উঁচু এলব্রুস উচ্চতায় এভারেস্টের ধারেকাছেও নয়। কিন্তু এর মেজাজ বোঝা দায়। যাত্রার আগে শাকিল নিজেই বলেছিলেন, উচ্চতা নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা নেই, সাবধান থাকতে হবে পাহাড়ের আচরণ নিয়ে। সেই আচরণের কঠিনতম রূপটাই এবার দেখলেন তিনি।
সমকালকে শাকিল জানান, পরিকল্পনা ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ভোরে চূড়ায় ওঠার। কিন্তু সেদিন পুরো দিনই আবহাওয়া বিরূপ ছিল। এজেন্সি অভিযান বাতিল করে দলকে ফিরে আসতে বলে। তবে রাতের আবহাওয়া কিছুটা শান্ত হতে পারে, এমন পূর্বাভাসও ছিল। সন্ধ্যায় শাকিল ও সহআরোহী হিদারকে নিয়ে বসলেন গাইড অ্যালেক্স। সিদ্ধান্ত হলো, একবার চেষ্টা করে দেখবেন।
তাঁদের বের হতে দেখে আরও দুটি দল পথে নামে। কিন্তু পূর্বাভাস মেলেনি। হিমশীতল ঝড়ো হাওয়া, চোখের সামনে কিছুই দেখা যায় না, পা ডুবে যায় বরফে। আবহাওয়া আরও খারাপ হলে দুটি দলই ফিরে যায়। শাকিল বলেন, এলব্রুসে পূর্বাভাসের ওপর ভরসা রাখা যায় না। তুষারঝড়ে পথ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। তবু তারা ফেরেননি। এক পা, তারপর আরেক পা। শেষে তিনজন একসঙ্গে দাঁড়ালেন চূড়ায়।
শাকিল বলেন, পাহাড় কখনো কখনো মানুষের শক্তি মাপে না। পাহাড় মাপে বিরূপ পরিস্থিতিতেও সে কতদূর যেতে রাজি, সেটা। এই জেদ শাকিলের পুরোনো সঙ্গী। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাগচালা গ্রামে তাঁর জন্ম। ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার থেকে হাঁটা শুরু করে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পেরিয়ে ১৯ মে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। পথে সাঁতরে পার হয়েছিলেন যমুনার ৩ কিলোমিটার। ৮৪ দিনের সেই ‘সি টু সামিট’ অভিযানে সপ্তম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন তিনি। তারও আগে, ২০২৩ সালে নেপালের পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটারের গ্রেট হিমালয়া ট্রেইল হেঁটে পাড়ি দেন। এবারের অভিযানের নাম ‘বাংলাদেশ-রাশিয়া ফ্রেন্ডশিপ অভিযান’। ১১ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডির রাশিয়ান হাউসে তাঁর হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা ছাড়েন। এলব্রুস ছিল তাঁর বড় স্বপ্নের দ্বিতীয় ধাপ। লক্ষ্য সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠা, পর্বতারোহণের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘সেভেন সামিট’। ১৯৮৫ সালে মার্কিন অভিযাত্রী রিচার্ড ব্যাস প্রথম মানুষ হিসেবে এই সাত চূড়ায় পা রাখেন।
ই-মেইল: [email protected], [email protected]