বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (FAO)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের বাজারে যে আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে, তা দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, গত আগস্ট মাসে ফুড প্রাইস ইনডেক্স বা খাদ্য মূল্য সূচক বেড়ে ১৩৩.৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের শেষভাগের পর সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক বাজারে চরম আবহাওয়া, ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় চিনি, ভোজ্যতেল ও খাদ্যশস্যের দাম রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে সরবরাহ সংকটের কারণে পাইকারিতে প্রতি মণ চিনির দাম প্রায় ২০০ টাকা বেড়ে প্রায় ৩,৮০০ টাকায় উঠেছে। এর আগে দাম ছিল ৩,৬০০ টাকা। ৩৭.৩২ কেজির এক মণ হিসাবে প্রতি কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়ে দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০২ টাকা। দাম এই পর্যায়ে পৌঁছানোর ঘটনাটিও বর্তমান চাপের একটি উদাহরণ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। ফলে খাদ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু আমদানি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; দেশের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতাকেও সচল রাখা জরুরি। এখানেই উৎপাদনশীল শিল্পকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের সঙ্গে শুধু কারখানার শ্রমিক নয়, কৃষক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন শ্রমিক, ডিলার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু কোম্পানির আর্থিক হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো সাপ্লাই চেইন, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত এবং ভোক্তা বাজারে তার অভিঘাত পড়ে।
সম্প্রতি প্রাইভেট ইকোনমিক জোনস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (PEZAB) এর একটি প্রস্তাব দেশের শিল্পায়নের অর্থায়ন সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। সংগঠনটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে প্রথমে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং পর্যায়ক্রমে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, উদ্যোক্তাদের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ১৫ বছরের জন্য ঋণ দেওয়া হবে, যার মধ্যে চার বছর থাকবে গ্রেস পিরিয়ড। প্রকল্প ব্যয়ের ৩০ শতাংশ উদ্যোক্তার নিজস্ব অর্থায়ন এবং ৭০ শতাংশ ঋণের মাধ্যমে পূরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাবের পেছনে যে বাস্তবতা রয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা বড় শিল্প প্রকল্পে বিনিয়োগের শুরুতেই বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। জমি উন্নয়ন, রাস্তা, পানি, ড্রেনেজ, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস নেটওয়ার্ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং অন্যান্য অবকাঠামো তৈরিতে বড় অঙ্কের মূলধন আটকে থাকে। কিন্তু কারখানা উৎপাদনে যাওয়ার আগে এসব বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য নগদ প্রবাহ তৈরি হয় না। ফলে উচ্চসুদের স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করলে প্রকল্পের আর্থিক চাপ দ্রুত বেড়ে যায়।
PEZAB-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২৩টি অনুমোদিত বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে, যার মধ্যে আটটি চূড়ান্ত সনদ পেয়েছে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনে রয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, অনেক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এসব অঞ্চলে কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হলেও অবকাঠামো উন্নয়নে বিলম্বের কারণে সেই বিনিয়োগ বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শুধু জমি বরাদ্দ বা অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা যথেষ্ট নয়; শিল্প স্থাপনের উপযোগী অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বড় উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতাও এই সমস্যার সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য উৎপাদক ও সরবরাহকারী সিটি গ্রুপ প্রায় ৪০টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা, লবণ, চাল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটিতে সরাসরি ২৫ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত এবং এর সঙ্গে কৃষক, ডিলার, পরিবহন শ্রমিক ও খুচরা বিক্রেতাসহ একটি বড় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক যুক্ত। কিন্তু এই বিশাল উৎপাদন সক্ষমতার পেছনেও রয়েছে বড় ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একাধিক শিল্প ইউনিট নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস ও জ্বালানি সংযোগ না পাওয়ায় সেগুলো কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে যেতে পারেনি। অর্থাৎ বিনিয়োগ করা হয়েছে, অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এ ধরনের পরিস্থিতির আর্থিক প্রভাবও ব্যাপক। কারখানা চালু না হলেও ব্যাংক ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে উৎপাদন থেকে যে নগদ প্রবাহ আসার কথা, তা না এলেও ব্যয় চলতে থাকে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে একটি উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানও চলতি মূলধনের সংকটে পড়তে পারে। তাই শিল্পের স্থায়িত্বের আলোচনায় শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, সেই ঋণের বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সিটি গ্রুপের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিভিন্ন উৎপাদন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক দায় পরিশোধ করে এসেছে এবং অতীতে ঋণখেলাপির রেকর্ড না থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এবং আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং (EY)-এর সহায়তায় ঋণদাতা ব্যাংকগুলো একটি সমন্বিত পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সম্পদ পুনর্বিন্যাস, মূলধন শক্তিশালীকরণ ও পরিচালনগত সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন সচল রেখে ব্যাংকগুলোর অর্থ পুনরুদ্ধার করাই এর অন্যতম লক্ষ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংকটকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করার নজির রয়েছে। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র জেনারেল মোটরসকে পুনর্গঠনের সহায়তা দিয়েছিল। কারণ প্রতিষ্ঠানটির পতনের প্রভাব শুধু একটি কোম্পানির ওপর নয়, পুরো অটোমোবাইল শিল্প, সরবরাহকারী ও বিপুল কর্মসংস্থানের ওপর পড়ার আশঙ্কা ছিল। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও বিভিন্ন সময়ে কৌশলগত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান রক্ষার পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই নীতিগত অবস্থান হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ। অনিয়ম, দুর্নীতি বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে অবশ্যই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কোনো উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের সংকট যদি মূলত অর্থায়ন, অবকাঠামো, জ্বালানি বা নগদ প্রবাহের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনে ফিরে আসার বাস্তব সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তার জন্য কাঠামোবদ্ধ পুনর্গঠন বিবেচনা করা যেতে পারে।
সিটি গ্রুপের মুখপাত্র এবং নির্বাহী পরিচালক জনাব মাশিউল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিটি গ্রুপ দীর্ঘ ৫৪ বছরের ইতিহাসে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে আসছে; শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তাই নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সরকারের রাজস্ব সরবরাহ ঠিক রাখতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও আরও জোরালোভাবে যাতে তা করতে পারি সে জন্য বদ্ধপরিকর। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের অংশীজনদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি এবং আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুতই আমরা ঘুরে দাঁড়াব।’