বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি ভ্রমণআমিয়াখুম ভ্রমণের ভয়াবহ অভিজ্ঞতালেখা: শায়লা এ্যামিন, শিক্ষার্থী, ঢাকাপ্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২: ৩৭ আমিয়াখুম জলপ্রপাতপ্রথম আলো ফাইল ছবিনাগরিক ভ্রমণ–১

আমার জীবনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়ংকর আর স্মৃতিতে জাগরূক হয়ে থাকবে এবারের নাফাখুম-আমিয়াখুম ট্যুর। প্রায় মরতে মরতে বেঁচে ফিরে এসেছি। আমি দীর্ঘদিন ট্যুর করি। এটা আমার প্যাশন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনেক দর্শনীয় স্থান আমার দেখা হয়েছে। অনেকদিন থেকেই আমার নাফাখুম–আমিয়াখুম যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু যেহেতু এটা ট্রেকিং ট্যুর আর এক্সপেনসিভ (অন্তত আমার কাছে), তাই ব্যাটে–বলে মিলছিল না। কিন্তু এবারের রোজার ঈদে সবকিছু মনমতো হয়ে যাওয়াতে বেরিয়ে পড়লাম নাফাখুমের উদ্দেশে।

রাত ৮টায় আমরা সায়েদাবাদ থেকে বান্দরবানের বাসে একটা ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে উঠে পড়ি। সেখানে আরও কয়েকটা ট্যুর গ্রুপ ছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ জন। বাস ছেড়ে দিল, তারপর রাতের ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম চকরিয়া। সেখান থেকে আরেকটা বাসে আলীকদম। আলীকদম থেকে চান্দের গাড়ি করে থানচি। থানচি থেকে ট্রলারে করে পদ্মঝিরি।

থানচি থেকেই মূলত নো নেটওয়ার্কের আওতায় পড়ে। কোনো নেট নেই এরপর আর। আর এখানেই আমাদের দুর্ভোগের সূচনা। কথা ছিল, আমাদের রেমাক্রি পর্যন্ত ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর সেখান থেকে ৪-৫ ঘণ্টা হেঁটে থুইসা পাড়ায় পৌঁছে যাব। কিন্তু বিধিবাম! ট্রেকিং যেহেতু করতে এসেছি, প্রকৃতি আমাদের ট্রেকিংয়ের আদ্যোপান্ত শিখিয়ে দিল। বলা হলো, তেলসংকটের কারণে ট্রলার আর সামনে যাবে না আমাদের এখান থেকেই ট্রেকিং শুরু করতে হবে। পদ্মঝিরি থেকে আমাদের ট্রেকিংয়ের শুরু হলো বেলা ১টায়।

প্রথমে ভালোই লাগছিল, ঝিরিপথ ধরে হাঁটছিলাম পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করতে করতে। দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর আবার ঝিরি ধরে হাঁটা। আসল খেলা শুরু হলো বিকেল ৪টার পর। একের পর এক পাহাড় চলে আসছিল সামনে। ওগুলো বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠি। সন্ধ্যা নেমে গেলে আমাদের বলা হলো দোকানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে। আর আধা ঘণ্টা হাঁটলেই আমরা থুনচিপাড়ায় পৌঁছে যাব। কিন্তু দেখা গেল, আধা ঘণ্টার স্থানে ২ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও পাড়ার দেখা মিলছে না। একে তো ক্লান্ত শরীর, তার ওপর উঁচু উঁচু খাড়া পাহাড়ের ঢাল। এর মধ্যে আবার রাত নেমে এসেছে। টর্চ জ্বালিয়ে সবাই হাঁটছিলাম। আমাদের গ্রুপে বেশ কয়েকজন ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব। তাঁরা আগে তেমন ট্যুর করেননি। এটা যে ট্রেকিং ট্যুর, তাঁরা এটাও জানতেন না। আমিয়াখুমের ভিউ দেখে আর হুজুগে পড়ে চলে এসেছেন। তাঁদের সবার অবস্থা খারাপ। হাঁটছেন আর হোস্টকে গালি দিচ্ছেন। ইয়াং যাঁরা, তাঁরাও হতাশ। এ রকম ট্যুর হবে, কেউ প্রত্যাশাই করেননি। সবার শরীর টালমাটাল। শুধু মনের জোরে হাঁটছেন সবাই। পথ যেন শেষই হয় না।

অন্ধকারে একবার পাহাড়ে উঠি আবার নেমে ঝিরিপথ দিয়ে হেঁটে আবার আরেকটা পাহাড়। আমার মনে হয়, ৭-৮টা পাহাড় অন্ধকারে আমরা অতিক্রম করেছিলাম। রাত প্রায় সাড়ে ১০টায় আমরা পাড়ায় পৌঁছে গেলাম। আমি লিটারেলি শুয়ে পড়লাম পাড়ার উঠানে। শরীরে আর এক বিন্দু শক্তি নেই। আধা ঘণ্টা এভাবে শুয়ে থাকার পর আমাদের জুমঘরে রুম ঠিক হলো। ৫ জন মেয়ের জন্য একটা রুম, যেখানে আবার রান্নাও হচ্ছে। ফ্লোরে চাঁটাই বিছিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা। না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। আমি ভেবেছিলাম, আমিয়াখুম বোধ হয় আর যেতে পারব না। শরীরে এত ব্যথা ছিল। ১২টা নাগাদ রাতের খাবার দিল। কোনোরকম মুখে গুঁজে তারপর কিছু ওষুধ খেয়ে নিলাম।