জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের কিছু উজ্জ্বল স্মৃতিকণিকা বাংলাদেশের জনগণের জন্য রয়ে যাবে। একটি হচ্ছে এবার সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালে ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
১৯৩ সদস্যের সংস্থায় চার দশকের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার সভাপতিত্ব পাওয়া সন্তোষজনক বৈ কি। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একই পরিবারভুক্ত তৃতীয় সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিলেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান। চমকপ্রদ এ ঘটনা নজিরবিহীন; যদিও তা আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে পারিবারিক প্রাধান্য নির্দেশ করে। অবশ্য ঘটনা দুটিই আপতিক। বিশ্ব পরিসরে আমাদের বিশেষ কোনো অবদান বা ভূমিকার কারণে এগুলো ঘটেনি। তেমন কোনো ভূমিকা আদৌ আমরা পালন করতে যাচ্ছি কিনা, সেটাও একটি প্রশ্ন হতে পারে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর নানা বিষয়ে সংস্কার নিয়ে অনেক উঠ-বস অনুশীলন হলো। প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক কমিশন গঠন করলেও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে তা হয়নি। তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২ সালে বলবৎ দেশের সংবিধানের কতক মূল আদর্শিক ও নীতিগত বিষয় থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তেমনি পররাষ্ট্রনীতিতেও মোড় পরিবর্তন ঘটছে।
আমাদের সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হিসেবে লিখিত আছে– ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়।’
মূল নীতিমালা অনুসরণ করে আমরা সার্বভৌমত্ব ও সমতা, যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ অনুসরণ এবং সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদ-বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছি। এতে প্রতিবেশীসহ বিশ্বের সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। ৫ আগস্টের পর এ ভারসাম্যে কিছু ব্যত্যয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দুবছর ধরেই সম্পর্ক খুব শীতল এবং প্রায় অস্বাভাবিক। জাতিসংঘ অধিবেশনে যাওয়ার প্রাক্কালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’ তথা নতুনভাবে শুরু করার লক্ষ্য ব্যক্ত করেন সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে। অন্যদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে দৃশ্যত সম্পর্কোন্নয়নের পাশাপাশি জোটনিরপেক্ষতা থেকে সরে এসে সদ্য গঠিত ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলে কথিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার অতি আগ্রহ প্রকাশ; সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহু সমালোচিত একপেশে বাণিজ্য চুক্তি করাসহ সার্বিক ভারসাম্য ওই বৃহৎ শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া লক্ষ্য করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই পটভূমিতে সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ এবং নিউইয়র্কে তাঁর চার দিনের সফরকালে কোন কোন শীর্ষ নেতার সঙ্গে সাইডলাইন বা পার্শ্ব বৈঠকগুলো হলো; বৈশ্বিক রাজনীতির কোন স্রোতধারার প্রতি আগ্রহ ব্যক্ত হলো; সেসবের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে।