রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি আয়োজনবিশ্ব শিক্ষক দিবস–নাগরিক: ১ আমাদের অভিভাবক করীম স্যারলেখা: মুহাম্মদ শফিকুর রহমানপ্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৩: ০৫ স্কুলের পেছনে একটি আমগাছ, পাশে নারকেল গাছ—চারপাশে ঝোপঝাড়। লুকানোর জন্য যেন আদর্শ জায়গা। সেদিন স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, বন্ধুরা সবাই চলে গেছে। আমি আমগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে শাবানার হাত ধরে বসে আছি। আমি তাকে ভালোবাসতাম, সে ভালোবাসত কিনা জানি না; তবে হাত ধরায় আপত্তি করেনি। হঠাৎ কাশির শব্দ। ফিরে দেখি, আমাদের হেড স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। গম্ভীর মুখে বললেন, ‘তোরা এখানে কী করিস?’ বুক ধড়ফড় করতে লাগল। শাবানা দ্রুত সরে গেল। স্যারও চলে গেলেন, যেন কিছুই দেখেননি। প্রশ্নের জবাবও শুনলেন না। সারা রাত চোখে ঘুম এল না।
পরের দিন স্যার যথারীতি ক্লাস নিলেন। তাঁর ক্লাসে টুঁ শব্দ হতো না—ভয়ে নয়, আনন্দে। তাঁর কথা আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। কী এমন বলতেন, আজও বুঝি না; তবে এমনভাবে পড়াতেন যে ক্লাসেই পড়া হয়ে যেত। ক্লাস শেষে তিনি আমার হাত ধরলেন, বললেন, ‘চল, আমার রুমে।’ ভয়ে তখন আমার অবস্থা খারাপ। স্যার শান্ত গলায় বললেন, শাবানার সঙ্গে তোর এত ঘনিষ্ঠতা কেন? শোন বাবা, ভালোবাসা অন্যায় নয়; কিন্তু তোদের এই বয়স ভালোবাসার নয়।’ সেদিনই শাবানাকে বললাম, এখন আর নয়, তুমি তোমার পথ দেখো। জবাবে সে বলেছিল, ‘বেইমান’! কষ্ট পেয়েছিলাম, আমিও রেগে গিয়েছিলাম। ছোটবেলার সেই মারামারি বেশিক্ষণ টেকেনি।
কিছুদিন পর স্যার স্কুলে কয়েকটি গাছের চারা এনে সবাইকে ডাকলেন। কেন গাছ লাগাতে হয় বুঝিয়ে বললেন। আমরা আনন্দ নিয়ে গাছ লাগালাম। তিনি বললেন, ‘অকারণে কখনো গাছ কাটবি না, একটি পাতাও ছিঁড়বি না।’ গরিব স্কুল—ফান্ডে টাকা থাকত না। স্যার নিজের টাকায় মুড়ি-চানাচুর কিনে আমাদের খাওয়াতেন। খাবার সামান্য হলেও সেই স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে। স্যার খুব কমই মারতেন; ভয় দেখাতেন, বুঝিয়ে বলতেন।
কৈশোরে সিগারেট খাওয়ার কৌতূহল জাগল। গোপনে সিগারেট আনলাম। এক বন্ধু বেইমানি করে খবর দিল। হেড স্যার হাতেনাতে ধরলেন। চিৎকার করে বললেন, ‘তোদের আজ পিটিয়ে মানুষ বানাব।’ দপ্তরি আবুলকে বেত আনতে বললেন। সবাই জড়ো হলো, শাবানাও ছিল। আমরা ভয়ে কাঁপছি—মার নয়, বাসায় খবর গেলে কী হবে সেই ভয়। স্যার কয়েকটা বেত মেরে আমাদের রুমে নিলেন। তারপর বেত ফেলে দিয়ে বললেন, ‘ব্যথা পেয়েছিস? তোদের মারলে আমারই কষ্ট হয়।’ তাঁর চোখে জল ছিল। তারপর সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, সিগারেট কেন খারাপ। সেই ঘটনার পর ৩৭ বছর কেটে গেছে, আজও সিগারেট ছুঁইনি; আর তিনি আমাদের বাসায় কিছুই জানাননি।
একদিন বন্ধু রিপন ফুটবল খেলতে গিয়ে নাক ফাটিয়ে ফেলল। রক্ত ঝরছে। স্যার দৌড়ে এলেন। রিপনের বাবা লাঠি হাতে এসে ছেলেকে মারতে উদ্যত হলে স্যার আগলে রাখলেন। চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তবেই বাড়ি পাঠালেন।
স্যার শুধু শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। কথায়, ভালোবাসায়, দায়িত্বে তিনি আমাদের আগলে রেখেছিলেন। বহু বছর হয়ে গেছে, তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন। আমাদের প্রিয় হেড স্যার করীম স্যার যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন।