একদিন আম্মু বললেন, ‘তোমার একাকিত্ব নিরসনে কিছু ব্যবস্থা করব।’ আমাদের টেলিভিশন ঠিক করা হলো। বিশ্বকাপ ফুটবল চলছিল তখন। আর্জেন্টিনা প্রথম রাউন্ডেই বাদ হয়ে যাওয়ায় খেলার প্রতি মোহও কমে গেল। অঙ্ক বই নিয়ে সমানুপাতের কিছু অঙ্ক করি, আর সম্পাদ্য। অন্য বইগুলো পড়তেও ইচ্ছা করে না, বিছানাবন্দী জীবন অসহ্য লাগে।
সেকালে, প্রায় বিশ বছর আগে খুব সচেতন লোক ছাড়া বাসাবাড়িতে তেমন কেউ পত্রিকা রাখতেন না। অবস্থা বিবেচনায় আম্মু পত্রিকা রাখতে একজন হকার ঠিক করলেন, যিনি পেপার দিতেন বেলা প্রায় ১১.৩০টা বা দুপুর ১২টার দিকে! এ ছিল আরেক মহাবিরক্তি! পেপারের অপেক্ষায় থেকে আগ্রহটাই মরে যেত। অনেকটা, বেটার লেইট দ্যান নেভার টাইপ।
কয়েক দিন পর আম্মু খুঁজে আরেকজন লোক নিয়ে এলেন, যিনি সকালে পেপার দিতে পারবেন। আম্মু বললেন, লোকটি হকার নয়, তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কাজ করেন এবং তাঁর লাইব্রেরি আছে। তিনি তাঁর নিজের জন্য যেসব পেপার নেবেন, অতিরিক্ত হিসেবে আমাদেরও সাপ্লাই দেবেন এমন।
লোকটির নাম আসাদউল্লাহ, হুজুর ধরনের, মধ্যবয়সী। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরেন, সাদা পাগড়ি মাথায়, কালো রংয়ের সাইকেলে চলতেন। ঠিক সকাল ৮.২০ থেকে ৮.৩০–এর মধ্যে তিনি পেপার দিতেন। গেট খুললে প্রথমে শুদ্ধ উচ্চারণে সালাম দিতেন। লোকটির আগে আমরা তাঁকে সালাম দিতে পারতাম না বা পারিনি কখনো! লোকটির শুদ্ধ উচ্চারণের সালাম শুনে আম্মু আমাকে বকতেন। বলতেন, ‘কখনো কাউকে আগে সালাম দিতে পারো না!’
প্রথমে আমরা রাখতাম যুগান্তর পত্রিকা। বছর ঘুরলে প্রথম আলো রাখতে ধরি। তখন প্রথম আলোর ছুটির দিনেতে ঘরমন জানলা দিত, থাকত কাওসার আহমদ চৌধুরীর রাশিফল। এই লোকটি রেগুলার পেপার দিতেন, প্রায় একই সময়ে। আমরাও ঠিক এই সময়েই পেপার নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। পেপারের সাপ্তাহিক বিভিন্ন ফিচারের সঙ্গে মিশে যায় আমাদের জীবনাচার।
এরই মধ্যে আমার শরীর সেরে ওঠে। অসুস্থতা আমাকে একজন নিয়মিত খবরের কাগজ পাঠকে পরিণত করে। অবশ্য এর পেছনে আসাদুল্লাহর সময়ানুবর্তিতার অবদানও অনেক।ভদ্র আচরণের দরুন আমাদের পরিবারের লোকেরাও আসাদুল্লাহকে পছন্দ করতেন। আমার খালা-মামাদের বিয়েতে অতিথি হিসেবেও তিনি উপস্থিত হয়েছেন। অনেকে ভাবতেন, তিনি আমাদের আত্মীয়। ঈদের সময় আসাদুল্লাহ তাঁর বাড়ির ঠিকানা বিস্তারিত জানিয়ে আমাদের সবাইকে যাওয়ার অনুরোধ করতেন, যদিও কখনোই যাওয়া হয়নি।