স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল ঠিক করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংঘাত ও সহিংসতামুক্ত ভোট নিশ্চিত করাকে প্রাধান্য দিচ্ছে তারা। এ ক্ষেত্রে অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরিচালনার অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগাতে চাইছে সংস্থাটি।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী নভেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোট শুরুর ‘প্রাথমিক পরিকল্পনা’ থেকে সরে আসায় ইসি এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে আরও সময় পাচ্ছে।
এর আগে ১২ নভেম্বর ইউপি নির্বাচন শুরুর ‘সম্ভাব্য তারিখ’ ঘোষণা করলেও সরকারের অসন্তোষ প্রকাশের পর সরে আসে ইসি। নভেম্বর-ডিসেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আগামী বছরের জানুয়ারিতে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের নতুন পরিকল্পনার কথা বলছে ইসি।
ইসি সূত্র বলছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইসির ডাকা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচন ঘিরে বিশেষ করে ‘বহিরাগতদের হস্তক্ষেপে’ ব্যাপক সহিংসতার শঙ্কা প্রকাশ করেন ইসি ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। ‘বহিরাগত’ বলতে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ভোটার এলাকার বাইরের প্রভাবশালীসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি ইঙ্গিত করেন তারা। নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গতি আনার কথাও বলেন কেউ কেউ। আলোচনা শেষে সম্ভাব্য সহিংসতা, বলপ্রয়োগ এবং ‘বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ’ প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত জানায় ইসি। গত মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং বিজিবি ও আনসার-ভিডিপির মহাপরিচালকদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তামূলক প্রস্তুতি শুরুর নির্দেশ দেন সিইসি। পুলিশের আইজিকে সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে।
পুলিশ, বিজিবি ও আনসারে ভরসা গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন ছিল। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেটি না রাখার সিদ্ধান্তের কথা আগেই জানিয়েছে ইসি। স্থানীয় নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের নজির নেই। কেবল গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে নামানো হয়। তবে স্থানীয় নির্বাচনে পরিস্থিতি বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখার চিন্তা-ভাবনাও আছে ইসির। এজন্য জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারেও এটিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আনতে চাইছে সংস্থাটি। তা ছাড়া ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।
ইসির আরও যত পরিকল্পনা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাত-সহিংসতা মোকাবিলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় কেন্দ্রীয়ভাবে আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করবে ইসি। ভোটের আগে-পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি নির্বাহী ও বিচারিক হাকিমদের মোতায়েন করা হবে। প্রায় ৪৬ হাজার ৪০০ ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা মেরামত অথবা নতুন করে স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। ভোটকেন্দ্র ও আশপাশে ক্যামেরা, ড্রোনসহ প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার এবং ভুল ও ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুল তথ্য প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম নেওয়া হবে।