শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি আয়োজনঅসমাপ্ত নকশিকাঁথালেখা: হৃদয় গোপাল সাহা, হাজীপুর, নরসিংদীপ্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ১৮ অলংকরণ: মাসুক হেলালসন্ধ্যার একটু পর অফিস থেকে বের হয়ে সবুজ যখন নতুনবাজার মোড়ে এল, তখনই তার এক কলিগ নাজমুল হোসেন বললেন, ‘সবুজ ভাই, নেটে দেখলাম, রাস্তায় অনেক যানজট, কী সব জানি আন্দোলন চলছে। চলুন, দুজনে গুলশান লেকে গিয়ে বসে আজ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে পরে বাসায় যাই। এর মধ্যে রাস্তার যানজট আর ঝামেলাও হয়তো শেষ হয়ে যাবে।’ কিন্তু সারা দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত লাগায় সবুজের ইচ্ছা হচ্ছিল না, তাই সে বলল, ‘নাজমুল ভাই, আজ ভালো লাগছে না, অন্য আরেক দিন বসে আড্ডা দিবনে।’ উনার থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুতই সে বাসে উঠেছিল। কিন্তু বাসে ওঠার কিছু সময় পর শুনতে পেল, রাস্তা বন্ধ, বাস আর যাবে না। যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছেন বাসচালকের সহকারী (হেলপার)। সবুজের তখন মাথায় হাত। কারণ, তার মেস উত্তরায়। কুড়িল বিশ্বরোডও তখন যাইনি বাস, তাহলে সে উত্তরা যাবে কীভাবে?

সেদিন রাস্তার যানজটের কারণ ছিল ছাত্র আন্দোলন। দেশে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে, এর মধ্যে আবার বর্ষাকাল হওয়ায় অনেক জায়গায় অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়ে গেল। এসবের মধ্যেইও পরীক্ষা চলছে। নির্দিষ্ট কিছু জেলায় নির্দিষ্ট তারিখের কিছু পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র নাকি কঠিন হচ্ছে। এ জন্য বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলে শিক্ষার্থীরা রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করছিল। উত্তরার প্রবেশপথ বন্ধ। ভেঙে ভেঙে অনেক যানবাহনে চড়ে আর অলিগলি ঘুরে ঘুরে তারপর মেসে গিয়েছিল সেদিন সবুজ।

যখন মেসে গেল, রাত প্রায় ৯টা বেজে গিয়েছিল। বড্ড ক্লান্ত থাকায় রুমে গিয়েই কখন যে বিছানায় বসতে গিয়ে শুয়ে গেল আর ঘুমিয়ে পড়ল, বুঝতেই পারিনি সে। হঠাৎ মোবাইলের রিংটোনে ঘুম ভেঙেছিল সবুজের, ঘুম ঘুম চোখে কল রিসিভ করেছিল। দেখল, অচেনা নাম্বার। মোবাইলের বিপরীত পাশ থেকে একজন তরুণী কণ্ঠ ভেসে আসছিল, ‘হ্যালো, আপনি কি সবুজ ভাই বলছেন?’ প্রত্যুত্তরে সে হ্যাঁ বলল। তারপর মেয়েটি বলল, ‘আপনি আমায় চিনবেন না, আমি সুমি, আমার মায়ের নাম কুসুম আক্তার। আপনি তাকে কাঁথা আন্টি বলে ডাকতেন। আম্মার থেকেই আমি আপনার নাম্বারটা পেয়েছি।’ ফর্মালিটি রক্ষা করতে সবুজ বলল, ‘ও আচ্ছা, চিনতে পারছি, আপনি কাঁথা আন্টির মেয়ে। আন্টি কেমন আছেন? মেয়েটি প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল, তারপর প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বলল, ‘আপনি কি আমাদের বাসায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আসতে পারবেন, একটু দরকার ছিল আপনার সাথে।’

সবুজের সঙ্গে কাঁথা আন্টির মেয়ের কী দরকার থাকতে পারে, তা সে বুঝতে পারছিল না। তখন তার মোটামুটি ঘুম ভেঙে গেছে। তবু মনে করতে কিছুটা সময় লাগল কাঁথা আন্টিকে। আগে যখন নিয়মিত সকালে হাঁটতে যেত সবুজ, তখনই আন্টির সঙ্গে তার পরিচয়, নরসিংদী থেকে ঢাকা চাকরির জন্য আসার আগে কোনো এক কারণে মোবাইল নম্বরটা দিয়ে এসেছিল সবুজ। মাস ছয়েক হয়ে গেল, সে–ও তেমন নরসিংদী যায় না, আবার গেলেও তেমন সকালে হাঁটতে বের হয় না। তাই সেদিকে যাওয়া হয় না। কাঁথা আন্টির কথা ভুলেই গিয়েছিল সবুজ।

সবুজ যখন এসব মনে করছিল, তখন মোবাইলের ওপাশে মেয়েটি বলে যাচ্ছিল, ‘হ্যালো, ভাইয়া, আপনি শুনতে পারছেন? হ্যালো, হ্যালো।’ সবুজ স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি শুনতে পারছি। আজ তো মঙ্গলবার, কাল বাদে পরশু বৃহস্পতিবার, সেদিন রাতে আমি বাড়ি যাব। শুক্রবার সকালে হাঁটতে গিয়ে আমি আন্টির সঙ্গে দেখা করে আসব।’ মেয়েটি বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে ভাইয়া।’ আর কিছু না বলে কলটা কেটে দিয়েছিল মেয়েটি।

বৃহস্পতিবার রাতে নরসিংদী বাড়িতে গিয়ে পরদিন শুক্রবার সকালে সবুজ হাঁটতে বের হলো। বাড়ি থেকে বের হয়ে বড় বাজার ব্রিজ হতে থানার ঘাট বেড়িবাঁধের রাস্তা দিয়ে সাধারণত সে হাঁটাহাঁটি করে। এই হাঁটা শেষ হয় নতুন লঞ্চঘাট ও বাউলঘাটের পর একটা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের রাস্তায় গিয়ে। এরপর ফিরতি পথে নতুন লঞ্চঘাট বরাবর মেইন রোডে হাঁটবে। কয়েকটা গ্যারেজ রয়েছে সে রাস্তায়, সেগুলোর পর একটা হলুদ রঙের গেট, সেটাই সবুজের কাঁথা আন্টির বাড়ি। হাঁটতে হাঁটতে আন্টির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকার ও মাঝেমধ্যে সে যে গিয়ে দেখা করত, কথা বলত, সেসব স্মৃতি মনে পড়তে লাগল তার।