মোবাইলটা টেবিলের ওপর রাখা। স্ক্রিনটা কালো।আরিফ জানে, ঠিক রাত ১২টা ১ মিনিটে একটি নোটিফিকেশন আসবে। কোনো নম্বর থাকবে না, কোনো প্রেরকের নাম থাকবে না। শুধু একটা ভয়েস মেসেজ। সাত দিন ধরে এই এক অদ্ভুত খেলার মধ্যে পড়েছে সে। প্রথম দিন যখন মেসেজটা এসেছিল, আরিফ ভেবেছিল বন্ধুদের কোনো সস্তা প্র্যাঙ্ক; কিন্তু ভয়েস মেসেজের অডিও ক্লিপটা প্লে করার পর গায়ের পশম খাড়া হয়ে গিয়েছিল।স্পিকার থেকে ভেসে আসা প্রতিটি শব্দ, টোন, নিশ্বাসের ওঠা-নামা—সবকিছু হুবহু তার নিজের মতো। একদম নিজের গলা। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়—অডিওর লোকটা বলে ভবিষ্যতের কথা।

প্রথম দিন মেসেজে বলেছিল, ‘কাল সকালে উঠে দেখবি, তোদের বারান্দায় একটা মরা শালিক পাখি পড়ে আছে। আর ঠিক দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় তোকে পেছন থেকে একটা কালো স্কুটি ধাক্কা মারবে। বাঁ পায়ে চোট পাবি।’পরদিন সকালে বারান্দায় সত্যি মরা পাখি পড়ে ছিল; আর দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে অত্যন্ত সতর্ক থাকা সত্ত্বেও ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় একটা কালো স্কুটি এসে জোরে ধাক্কা মারে। আরিফ বাঁ পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পায়।পরের দিনগুলোতেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। অডিও যা বলেছে, তা এক চুলও এদিক-ওদিক হয়নি। প্রতিটি রাত তাকে জানান দিয়েছে, আগামীকাল কেমন হতে চলেছে। ভাগ্য যেন নিজের কণ্ঠেই রেকর্ড হয়ে তার কাছে প্রতিদিন ফিরে আসছে।রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত বাক্যটা আরিফের মনে ভেসে উঠল, ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে।’কিন্তু তার চেতনার রং এখন শুধুই ছাইরঙা এক অন্ধকার। নিজের চেতনা যখন নিজেরই ভবিষ্যতের ঘাতক হয়ে ওঠে, তখন মানুষ কোথায় লুকাবে?

ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁলো।টিং!মোবাইলের নীল আলোয় অন্ধকার ঘরটা মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। নতুন অডিও বার্তা এসেছে। অডিও ফাইলটার দৈর্ঘ্য মাত্র ২০ সেকেন্ড।আরিফের হাত কাঁপছিল। ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল। থাম্বপ্রিন্ট দিয়ে লক খুলে প্লে বাটনে চাপ দিল।স্পিকার থেকে ভেসে এল তার নিজেরই শান্ত, নির্বিকার কণ্ঠস্বর:‘আরিফ, কাল রাত ৯টা বেজে ৪৫ মিনিটে তুই একজন মানুষকে হত্যা করবি। ভিকটিমের বুকের ঠিক বাঁ পাশে তুই একটা ধারালো কাচের টুকরা ঢুকিয়ে দিবি। তুই চেষ্টা করবি এটা আটকানোর; কিন্তু পারবি না। রক্তে তোর হাত ভেসে যাবে।’বার্তাটি শেষ হয়ে গেল।আরিফের চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ থমকে গেল। নিশ্বাস আটকে এল। মাথা ঘুরতে শুরু করল। হত্যা? সে একজন মানুষকে খুন করবে?না, এটা অসম্ভব! শান্তশিষ্ট একজন মানুষ। ঝগড়াঝাঁটি এড়িয়ে চলাই যার স্বভাব। সে কীভাবে একজন মানুষকে হত্যা করবে?আরিফ ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। মাথার ভেতরে চিন্তাগুলো পাগলের মতো ঘুরতে লাগল। অডিওর লোকটা যদি সে নিজেই হয়, তবে কেন এমন পূর্বাভাস দিচ্ছে? অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে কি নিজের সাজানো কোনো ফাঁদে পা দিতে চলেছে?কানের কাছে কারা যেন ফিসফিস করে গান গেয়ে উঠল:আঁধার রাতে নিজের আলোয় দেখছ নিজের মুখ,যে হাত কাল রক্ত ছোঁবে, সে হাত খোঁজে সুখ।নিয়তি এক গোলকধাঁধা, পথ হারিয়ে যায়,যে নিজেরে বাঁচাতে চায়, সে-ই তো ফাঁদে পায়।মোবাইলটা ছুড়ে ফেলে তোশকের ওপর। ঠিক করল, কাল সে ঘরের বাইরে এক পা-ও বাড়াবে না। দরজায় তালা দিয়ে বসে থাকবে। একা থাকলে কাউকে খুন করবে কীভাবে?

পরদিন সকাল।সূর্যের আলো উঠে এলেও আরিফের মনের ভেতরের রাত কাটল না। অফিসে ছুটি নিয়ে নিল। ঘরের সব জানালা বন্ধ করে দিল, ভারী পর্দা টেনে দিল। প্রধান দরজায় ভেতর থেকে দুটি বড় তালা লাগিয়ে দিল। রান্নাঘর থেকে সব ধরনের ছুরি, কাচ ও সুচালো জিনিসপত্র এনে একটা প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে বারান্দার এক কোণে লক করে রেখে এল।যে ঘরে কাচের তৈরি কিছু নেই, যেখানে কোনো মানুষ নেই, সেখানে সে কীভাবে কাউকে কাচের টুকরা দিয়ে আঘাত করবে?দুপুর পার হয়ে বিকেল হলো। ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করছে তাকে। ঘরের দেয়ালগুলো ঘনিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। আরিফ পায়চারি করতে লাগল। প্রতিমুহূর্তে ঘড়ি দেখছে। সময় যেন তার জন্য থেমে আছে, আবার যেন খুব দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

সন্ধ্যা ৭টা।হঠাৎ ল্যান্ডলাইন ফোনটা বেজে উঠল। এই ল্যান্ডলাইন অনেক পুরোনো, প্রায় কেউ ফোন করে না। ইতস্তত করে রিসিভারটা তুলল।অপর প্রান্ত থেকে ছোট বোনের গলা ভেসে এল। বোন শুভ্রা থাকে শহরের অপর প্রান্তে।‘দাদা! তুই কোথায়? তোর মোবাইলে রিং হচ্ছে; কিন্তু তুই ধরছিস না!’ শুভ্রার গলায় চরম আতঙ্ক।‘শুভ্রা? কী হয়েছে? তুই কান্নাকাটি করছিস কেন?’ আরিফ চট করে দরজার দিকের তালাগুলোর দিকে তাকাল।‘দাদা, বাবা...বাবা হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়ে পড়ে গেছেন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছিলাম; কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম! অ্যাম্বুলেন্স আসতে পারছে না। তুই কি প্লিজ আমাদের বাসার কাছের সেই ডাক্তারবাবুকে নিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে পারবি? প্লিজ দাদা, বাবা হয়তো আর বেশিক্ষণ...’ শুভ্রা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।আরিফের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। বাবা!তার মন থেকে হত্যা, অডিও মেসেজ, রাত ৯টা ৪৫, সব ভয় একমুহূর্তের জন্য উড়ে গেল। সে ছাড়া এখন বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার আর কেউ নেই। শুভ্রা একা অত বড় বিপদে কী করবে?

আরিফ চাবি হাতে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল; কিন্তু লক খুলতে গিয়ে থমকে গেল।রাত এখন ৮টা ৩০ মিনিট। ৯টা ৪৫ হতে আর এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট বাকি।সে কি বের হবে? অডিও মেসেজ তো বলেছিল সে কাল খুন করবে; কিন্তু এখন তো বাবার জীবন–মরণের প্রশ্ন! সে কি নিজের বাবার কথা ভেবে ঘরে বসে থাকবে? নাকি বাইরে বের হয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে?আরিফ নিজের মনকে শক্ত করল। ‘না, অডিওটা যা-ই বলুক, আমি সচেতন থাকব। আমি কাচ স্পর্শও করব না। আমি মানুষকে বাঁচাতে যাচ্ছি, মারতে নয়।’রবীন্দ্রনাথের গান মনে পড়ে গেল তার—‘অগ্নিগ্রাস হতে বাঁচাও, হে নাথ!আমার এ ভয় দূর করো...’আরিফ ছিটকিনি খুলে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।