বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginবন্ধুদের লেখাকার্যক্রমফিচারখেলাক্যারিয়ারমনোবন্ধুফটো ফিচারবন্ধুসভা সম্পর্কে ফিচারপাহাড়ের পথে (দ্বিতীয় পর্ব) অন্ধকার পাহাড়পথ ও শুভর নীরব ভালোবাসালেখা: রাশেদ খাঁনপ্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০০ চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে শান্ত জলধারা আর পানিতে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি—যেন বাস্তব পৃথিবীর কোনো পরিচিত জায়গায় নয়, ছবির ভেতর দাঁড়িয়ে আছি।সঙ্গে অনেকে থাকায় ভয় পেলাম না। নাফাখুমে বেশিক্ষণ না থেকে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এই পথে ফিরে আসার সময় নাফাখুম ঘুরে দেখা হবে—সবাই মিলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

জিন্নাপাড়া অভিমুখী যাত্রার ওই পর্বটা ভিন্ন রকম। ১২ জন মোট চারটি দলে ভাগ হয়ে গেলাম। প্রতিটি দলে একটা করে টর্চলাইট। সবার সামনে আছেন ট্যুর গাইড শিমিয়ান দাদা। তিনি পাহাড়ি পথের খুঁটিনাটি সবই জানেন। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আর আমরা সবাই পিঁপড়ার লাইনের মতো অনুসরণ করছিলাম। অচেনা, অন্ধকার ওই পথে যান্ত্রিক কোনো কোলাহল নেই। পাশ দিয়ে বহমান জলধারার কলকল ধ্বনি, জ্যোৎস্নার আলো এবং পাহাড় থেকে আসা বিভিন্ন রকম শব্দ সেই রাতটাকে সত্যিই বিশেষ করে তুলেছিল।

মন হারিয়ে যায় অচেনা পাহাড়ি পথের আলোর দিশারি, আকাশের স্নিগ্ধ চাঁদটির প্রেমে। অনেকক্ষণ হাঁটার কারণে খুবই ক্ষুধা লেগেছিল সবার। একজনের ব্যাগে এক পোয়া মুড়ি ছাড়া কিছুই ছিল না। চাঁদের আলোয় কোনো এক বিশাল পাথরের ওপর বসে সবাই মিলে ওই মুড়ি খেলাম। শরীরে ক্লান্তি এবং পেটে ক্ষুধা থাকায়, সেদিন রাতে ওই অল্প মুড়িই সবচেয়ে সুস্বাদু লেগেছিল। জ্যোৎস্নার আলোয় খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। কখন পৌঁছাব জিন্নাপাড়ায়? প্রশ্নটা সবাই বারবার করছিল শিমিয়ান দাদাকে। শরীর যেন আর পারছিল না ধকল সইতে। এভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা হেঁটে রাত সাড়ে নয়টার দিকে পৌঁছালাম জিন্নাপাড়ায়।

দিনের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দেওয়ার পর পাহাড়ি এই ছোট্ট পাড়ায় পৌঁছে মনে হয়েছিল, যেন সভ্যতার চেনা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অন্য এক জগতে এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা যেদিন জিন্নাপাড়ায় পৌঁছাই, সেদিন ছিল খ্রিষ্টানধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব বড়দিন। ফলে পাহাড়ি রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যেও ছিল উৎসবের আলাদা এক আবহ। আমরা যে বাড়িটিতে উঠেছিলাম, সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

পাহাড়ের মানুষের আতিথেয়তা সত্যিই অনন্য। জুমচাষের ফসল, পাহাড়ি পরিবেশে উৎপাদিত নানা উপকরণ এবং বাড়িতে পালন করা হাঁসসহ বিভিন্ন খাবার দিয়ে আমাদের জন্য রান্না করা হয়। এমন স্বাদের খাবার আগে কখনো খেয়েছি কি না, মনে করতে পারি না। খাবারের উপকরণের চেয়েও বেশি ছিল সেই খাবারে পাহাড়ি মানুষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার স্বাদ।

খাওয়াদাওয়া শেষে উপভোগ করলাম জীবনের প্রথম পাহাড়ি বড়দিনের উৎসব। নিজেদের মতো করে তারা একটি মঞ্চ সাজিয়েছিল। সেখানে নিজেদের ভাষায় লেখা ও গাওয়া গান পরিবেশন করে এবং তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নৃত্যও ছিল। আমরা গানগুলোর সব কথা বুঝতে পারিনি। কিছু কিছু অংশ বোঝা যাচ্ছিল, কিন্তু বেশির ভাগই ছিল তাদের নিজস্ব ভাষার গান। তবে আনন্দের ভাষা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি। উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল, তারা শুধু একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অনুষ্ঠান করে থেমে থাকেনি। নেচে-গেয়ে, দলবদ্ধভাবে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বড়দিনের গান পরিবেশন করে। আমরা যে বাড়িতে ছিলাম, সে বাড়িতেও এসেছিল। পর্যায়ক্রমে অন্য বাড়িতেও যায়। পাহাড়ের প্রতিটি বাড়ি যেন সেই রাতে একটি বড় পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে।