ঘুম মানুষের জৈবিক অস্তিত্বের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নিদ্রা শরীরকে পুনর্গঠন করে, মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়, ক্লান্ত সত্তাকে পুনরায় কর্মক্ষম করে। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিদ্রা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন বিশ্রাম আর পুনর্গঠনের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে সময়ের নীরব অপহরণ। সমস্যা ঘুমে নয়, সমস্যাটি অতিরিক্ততায়; বিশ্রামে নয়, অচেতন অভ্যাসে।

ধরা যাক, একজন মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিদিন মাত্র দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুমিয়ে কাটালেন। দুই ঘণ্টা শুনতে সামান্য; কিন্তু জীবন কখনো একক মুহূর্তের হিসাব নেয় না, সে সমষ্টির নির্মম অঙ্কে আমাদের সামনে আয়না ধরেছে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম মানে বছরে ৭৩০ ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রায় ৩০ দিন ১০ ঘণ্টা। দশ বছরে ৭ হাজার ৩০০ ঘণ্টা, প্রায় ৩০৪ দিন। আর ষাট বছরে এই অতিরিক্ত সময় দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৮০০ ঘণ্টা, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৮২৫ দিন বা পূর্ণ ৫ বছর।

ভাবুন, জীবনের পাঁচটি বছর যদি কেবল অতিরিক্ত নিদ্রার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকে, তবে সেই পাঁচ বছর আসলে কত অদৃশ্য সম্ভাবনার সমাধি! পাঁচ বছরে একজন মানুষ অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ করতে পারেন, নতুন কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে পারেন, গবেষণা করতে পারেন, শিল্পচর্চা করতে পারেন, অসংখ্য মানুষের জীবন স্পর্শ করতে পারেন, অথবা নিজের ভেতরে এমন এক জ্ঞানলোক নির্মাণ করতে পারেন, যার আলো মৃত্যুর পরও অন্যের পথকে আলোকিত করবে।

সময়ের অপচয় নিছক কয়েকটি ঘণ্টার অপচয় নয়; এটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু। যে মুহূর্তটি আমরা অবহেলায় বিসর্জন দিই, তার সঙ্গে কেবল বর্তমানই হারায় না, হারিয়ে যায় সেই মুহূর্ত থেকে জন্ম নিতে পারত এমন অসংখ্য ভবিষ্যৎ।

মানুষের সবচেয়ে বিস্ময়কর আত্মপ্রবঞ্চনা হলো, সে নিজের মৃত্যুকে জানে, কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতাকে অনুভব করে না। আমরা জানি জীবন অনিত্য, তবু আচরণ করি যেন আমাদের হাতে অনন্তকাল জমা আছে। আগামীকালকে এমন এক সম্পদ মনে করি, যার ওপর আমাদের অবিচ্ছেদ্য মালিকানা রয়েছে। অথচ আগামীকাল কখনো প্রতিশ্রুত নয়; প্রতিশ্রুত কেবল এই মুহূর্ত।

সময়ের প্রকৃতি বড় নির্মম। সে কারও দুঃখে থামে না, কারও সাফল্যে দ্রুততর হয় না, কারও অনুতাপে ফিরে তাকায় না। রাজা ও ভিখারি, জ্ঞানী ও অজ্ঞ, সফল ও ব্যর্থ—সবার জন্য সময়ের প্রবাহ অভিন্ন। পার্থক্য শুধু এই যে, কেউ সময়ের স্রোতে নিজের অস্তিত্বের অর্থ নির্মাণ করে, আর কেউ সেই স্রোতের ভাসমান আবর্জনার মতো অচিহ্নিতভাবে বিলীন হয়ে যায়।